মঙ্গলবার   ২২ অক্টোবর ২০১৯   কার্তিক ৭ ১৪২৬   ২২ সফর ১৪৪১

পিরোজপুর সংবাদ

আসহাবুল উখদুদের ঘটনা থেকে ১২টি শিক্ষা

প্রকাশিত: ১০ অক্টোবর ২০১৯  

 


সুহাইব (রা.) থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : 
পূর্ববর্তী যুগে এক বাদশাহ ছিল। তার ছিল এক যাদুকর। বার্ধ্যক্যে পৌঁছে সে বাদশাহকে বলল, ‘আমি তো বৃদ্ধ হয়ে পড়েছি, সুতরাং একজন যুবককে আপনি আমার কাছে প্রেরণ করুন, যাকে আমি যাদুবিদ্যা শিক্ষা দিব।’ কথামতো বাদশাহ তার কাছে এক যুবককে প্রেরণ করল। যুবকের যাত্রাপথে ছিল একজন আলিম। যুবক তার কাছে বসল এবং তার কথা শুনল। তার কথা যুবকের খুব পছন্দ হলো। তারপর যুবক যাদুকরের কাছে যাত্রাকালে সর্বদাই আলিমের কাছে যেত এবং তার নিকট বসত। তারপর সে যখন যাদুকরের কাছে যেত দেরি হওয়ার কারণে যাদুকর তাকে মারধর করত। ফলে যাদুকরের ব্যাপারে সে আলিমের কাছে অভিযোগ করল। তখন ধর্মযাজক বলল, ‘তোমার যদি যাদুকরের ব্যাপারে ভয় হয় তবে বলবে, আমার বাড়ি থেকে আসতে দেয়নি। আর যদি তুমি তোমার গৃহকর্তার ব্যাপারে আশঙ্কাবোধ করো তবে বলবে, যাদুকর আমাকে বিলম্বে ছুটি দিয়েছে।’

এমনিভাবে চলছিল দিন। একদিন হঠাৎ সে এক ভয়ানক হিংস্র প্রাণীর সম্মুখীন হলো, যা লোকেদের পথ আটকিয়ে রেখেছিল। এ অবস্থা দেখে সে বলল, আজই জানতে পারব, যাদুকর উত্তম না আলিম উত্তম। এই বলে একটি পাথর হাতে নিয়ে সে বলল, হে আল্লাহ! যদি যাদুকরের চাইতে আলিম আপনার কাছে পছন্দনীয় হয়, তবে এ পাথরাঘাতে হিংস্র প্রাণীটি নিঃশেষ করে দিন, যেন লোকজন চলাচল করতে পারে। এরপর সেটা জন্তুটার প্রতি ছুঁড়ে মারল। সাথে সাথে সেটা মারা গেল। ফলে লোকজন আবার যাতায়াত শুরু করল। 

এরপর সে আলিমের কাছে এসে তাকে সম্পূর্ণ ঘটনা বলল। আলিম বলল, ‘বৎস! আজ তুমি আমার থেকেও শ্রেষ্ঠ। তোমার মর্যাদা এ পর্যন্ত পৌঁছেছে যা আমি দেখতে পাচ্ছি। তবে শীঘ্রই তুমি পরীক্ষার সম্মুখীন হবে। যদি পরীক্ষার মুখোমুখি হও তবে আমার কথা গোপন রাখবে।’
এদিকে যুবক আল্লাহর হুকুমে জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য দান করতে লাগল এবং লোকদের সমুদয় রোগ-ব্যাধির নিরাময় করতে লাগল। বাদশাহর পরিষদবর্গের এক লোক অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তার ব্যাপারে জানতে পেরে সে বহু হাদিয়া-উপঢৌকন নিয়ে তার নিকট আসলো এবং তাকে বলল, ‘তুমি যদি আমাকে আরোগ্য দান করতে পার তবে এসব মাল আমি তোমাকে দিয়ে দিব।’ যুবক বলল, আমি তো কাউকে আরোগ্য দান করতে পারি না। আরোগ্য তো দেন আল্লাহ তায়ালা। তুমি যদি আল্লাহর উপর ঈমান আনো তবে আমি আল্লাহর কাছে দুয়া করব, আল্লাহ তোমাকে আরোগ্য দান করবেন। তারপর সে আল্লাহর উপর ঈমান আনলো। আল্লাহ তায়ালা তাকে রোগ মু্ক্ত করে দিলেন। এরপর সে বাদশাহর কাছে এসে অন্যান্য দিনের ন্যায় এবারও বসল। বাদশাহ তাকে প্রশ্ন করল, কে তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছে? সে বলল, আমার পালনকর্তা। এ কথা শুনে বাদশাহ তাকে আবার প্রশ্ন করল, আমি ছাড়া তোমার অন্য কোন পালনকর্তাও আছে কি? সে বলল, আমার ও আপনার সকলের প্রতিপালকই মহান আল্লাহ।
বাদশাহ্ তাকে পাকড়াও করে অবিরতভাবে শাস্তি দিতে লাগল। অবশেষে সে ঐ যুবকের সন্ধান দিল। যুবককে নিয়ে আসা হলো। বাদশাহ্ তাকে বলল, ‘প্রিয় বৎস! তোমার যাদু এ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে, তুমি অন্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকেও নিরাময় করতে পার।’ বালক বলল, ‘আমি কাউকে নিরাময় করতে পারি না। নিরাময় করেন আল্লাহ।’ 
ফলে বাদশাহ তাকে শাস্তি দিতে লাগল, অবশেষে সে ওই আলিমের কথা বলে দিল। এরপর আলিমকেও ধরে আনা হলো এবং তাকে বলা হলো, ‘তুমি তোমার দীন থেকে ফিরে এসো।’ সে অস্বীকার করল, ফলে তার মাথার তালুতে করাত রেখে দেহটাকে দু’টুকরো করে ফেলা হলো। এতে তার মাথাও দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল। 
এরপর ঐ যুবকটিকে আনা এবং তাকেও বলা হলো, ‘তুমি তোমার দ্বীন থেকে ফিরে এসো।’ সেও অস্বীকার করল। বাদশাহ তাকে তার কিছু সহচরের হাতে অর্পণ করে বলল, ‘তোমরা তাকে অমুক পাহাড়ে নিয়ে যাও এবং তাকেসহ পাহাড়ে আরোহণ করো। পর্বতশৃঙ্গে পৌঁছার পর সে যদি তার ধর্ম থেকে ফিরে আসে তো ভালো। নতুবা তাকে সেখান থেকে ছুঁড়ে মারবে।’ তারা তাকে নিয়ে গেল এবং পর্বতে আরোহণ করল। তখন যুবক দুয়া করে বলল, ‘হে আল্লাহ! তোমার যেভাবে ইচ্ছা আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষ করো।’ তৎক্ষণাৎ পাহাড় কেঁপে উঠল। ফলে তারা পাহাড় হতে গড়িয়ে পড়ল। আর সে হেঁটে হেঁটে বাদশাহর কাছে চলে এলো। এ দেখে বাদশাহ্ তাকে প্রশ্ন করল, তোমার সাথীরা কোথায়? সে বলল, আল্লাহ আমাকে তাদের চক্রান্ত হতে সংরক্ষণ করেছেন। 
আবারো বাদশাহ্ তাকে তার কতিপয় সহচরের হাতে সমর্পণ করে বলল, তোমরা তাকে নিয়ে নাও এবং নৌকায় উঠিয়ে তাকে মাঝ সমুদ্রে নিয়ে যাও। এরপর সে যদি তার দ্বীন (ধর্ম) হতে ফিরে আসে তবে ভালো, নতুবা তোমরা তাকে সমু্দ্রে ফেলে দাও। তারা তাকে সমুদ্রে নিয়ে গেল। এবারও সে দুয়া করে বলল, ‘হে আল্লাহ! তোমার যেভাবে ইচ্ছা তুমি আমাকে তাদের চক্রান্ত থেকে রক্ষা করো।’ তৎক্ষণাৎ নৌকাটি তাদেরসহ উল্টে গেল। ফলে তারা সকলেই পানিতে ডুবে গেল। আর যুবক হেঁটে হেঁটে বাদশাহ্র কাছে চলে এলো। এ দেখে বাদশাহ্ তাকে আবার প্রশ্ন করল, তোমার সঙ্গীগণ কোথায়? সে বলল, ‘আল্লাহ আমাকে তাদের ষড়যন্ত্র হতে রক্ষা করেছেন।’ 
এরপর সে বাদশাহকে বলল, ‘তুমি আমাকে হত্যা করতে পারবে না যে পর্যন্ত না তুমি আমার নির্দেশিত পদ্ধতি অবলম্বন করবে।’ বাদশাহ বলল, সে আবার কি? যুবক বলল, একটি ময়দানে তুমি লোকদেরকে জমায়েত করো। এরপর একটি কাষ্ঠশূলিতে আমাকে উঠিয়ে আমার তীরদানী হতে একটি তীর নিয়ে সেটাকে ধনুকের মাঝে রাখো। এরপর ‘এই যুবকের রবের নামে’ বলে আমার দিকে তীর নিক্ষেপ করো। এরকমটা করলেই তবে তুমি আমাকে মেরে ফেলতে পারবে। 

তার কথা অনুসারে বাদশাহ লোকদেরকে এক মাঠে জমায়েত করল এবং তাকে একটি কাষ্ঠশূলিতে চড়ালো। এরপর তার তীরদানী হতে একটি তীর নিয়ে সেটাকে ধনুকের মাঝে রেখে ‘এই যুবকের রবের নামে’ বলে তার দিকে নিক্ষেপ করল। তীর তার কানের নিম্নাংশে গিয়ে বিঁধল। সে তীরবিদ্ধ স্থানে নিজের হাত রাখল এবং সাথে সাথে প্রাণ ত্যাগ করল। 
এ দৃশ্য দেখে রাজ্যের লোকজন সমস্বরে বলে উঠল, ‘আমরা এ যুবকের রবের ওপর ঈমান আনলাম।’ 

এ সংবাদ বাদশাহকে জানানো হলো এবং তাকে বলা হলো, লক্ষ্য করেছেন কি? আপনি যে পরিস্থিতি হতে আশঙ্কা করছিলেন, সে পরিস্থিতিই আপনার মাথার উপর চেপে বসেছে। সকল মানুষই যুবকের রবের ওপর ঈমান এনেছে। এ দেখে বাদশাহ সকল রাস্তার মাথায় গর্ত খননের নির্দেশ দিল। গর্ত খনন করা হলো এবং সেগুলোতে আগুন জ্বালানো হলো। এরপর বাদশাহ আদেশ করল, যে লোক তার ধর্মমত বর্জন না করবে তাকে এ অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ করা হবে। কিংবা সে বলল, সে যেন অগ্নিকুন্ডে প্রবেশ করে। লোকেরা দলে দলে অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপিয়ে পড়ল। 

এক মহিলা একটি শিশু নিয়ে অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপ দেওয়ার ব্যাপারে ইতস্তত করছিল। এ দেখে দুধের শিশু মাকে বলল, ‘আম্মাজান! ঝাঁপিয়ে পড়ুন। আপনি তো সত্য দীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছেন (সুতরাং মরতে দ্বিধা কিসের?)। [মুসলিম, আসসাহিহ, কিতাবুয যুহদ : ৭৪০১] 

১২টি শিক্ষা

১. পূর্বযুগে জনগণকে শোষণ করার জন্য রাজারা ‘ব্ল্যাক ম্যাজিক’ বা কালোযাদু ব্যবহার করতো। ঠিক যেমন আজকের শোষকরা ব্যবহার করছে তাদের পদলেহী মিডিয়া। 

২. যাদু শেখানোর জন্য বাছাই করা হয়েছে একজন যুবককে। যুগে যুগেই জালিমদের টার্গেট ছিল যুবসমাজকে কাবু করে নেয়া। কারণ এরা হলো জাতির মেরুদন্ড। মেরুদন্ডকে অবশ করে দিতে পারলে শোষণের বিরুদ্ধে আর কেউ থাকবে না রুখে দাঁড়াবার। 

৩. চারিদিকে যখন অন্ধকারের হাতছানি, জাহিলিয়াতের সয়লাব তখন অসমর্থ তাওহিদবাদিরা হন সমাজচ্যুত। নিরবে-নিভৃতে লিপ্ত থাকেন আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যে। 

৪. সেই নিরব মারকাযগুলো থেকেই পূনরায় তাওহিদের আওয়াজ ওঠে। 

৫. আল্লাহ তার নিদর্শন প্রকাশ করে কারও অন্তরের ঈমানকে সুদৃঢ় করে দেন। 

৬. কারামত সত্য। আল্লাহ তায়ালা মুমিনকে তার ইমান অনুযায়ী কারামত দিয়ে সম্মানিত করে থাকেন। 

৭. অসুস্থতা বা সুস্থতার মালিক একমাত্র আল্লাহ। কারও কোনো ক্ষমতা নেই কাউকে অসুস্থ বা সুস্থ করার। তবে নেককার বান্দারা দুয়া করলে আল্লাহ সে দুয়া কবুল করেন। 

৮. ঈমানের অগ্নি পরীক্ষা দেওয়া ছাড়া পূর্ণ মুমিন হওয়া যায় না। ঘটনায় বর্ণিত আলিম শাহাদাত বরণ করেছেন, কিন্তু ঈমান বিসর্জন দেননি। আপোস করেননি। কোনো দাঈ বা আলিমের জন্য তাগুত রেজিমের সাথে আপোস করা বৈধ নয়। জালিম শাসকের সামনে সত্য তোলে ধরা সর্বোত্তম জিহাদ। 

৯. শোষকদের পক্ষ থেকে বাধাবিপত্তি আসবেই। কিন্তু আল্লাহর সাথে দৃঢ় সম্পর্ক থাকলে আল্লাহ তাদের সমস্ত চক্রান্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত করবেনই। 

১০. বেঁচে থাকার চেয়ে কখনও মৃত্যুকে বরণ করে নেয়ার মাঝেই অধিক কল্যাণ থাকে। একজনের আত্মবিসর্জনে পরিবর্তনের ঢেউ লাগতে পারে পুরো জাতির চিন্তা-চেতনায়। মজলুমের খুন থেকেই জ্বলে ওঠতে পারে বিপ্লবের মশাল। 

১১. তাগুতরাও চক্রান্ত করে, আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করেন। আল্লাহর কৌশলের সামনে মাঠে মারা পড়ে তাগুতি শক্তির সমস্ত চক্রান্ত। যে ভয় থেকে তারা হত্যা করে তাওহিদবাদীদেরকে, সে ভয়ই তাদেরকে গ্রাস করে। 

১২. সফলতা আমরা দু’চোখে যা দেখি সেটাই না, বেঁচে থাকার চেয়ে কখনও হাসিমুখে মরণকে বরণ করার মাঝেও সফলতা বিদ্যমান থাকে। 

এই বিভাগের আরো খবর