বুধবার   ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০   ফাল্গুন ৬ ১৪২৬   ২৪ জমাদিউস সানি ১৪৪১

পিরোজপুর সংবাদ

ইসলামের দৃষ্টিতে রোগীর প্রতি চিকিৎসকের দায়িত্ব

পিরোজপুর সংবাদ

প্রকাশিত: ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

রোগীর প্রতি চিকিৎসকের দায়িত্ববোধ কেমন হওয়া উচিত তা বলে বুঝানোর প্রয়োজন নেই। রোগীর প্রতি চিকিৎসকের দায়িত্ব, চিকিৎসা শাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ায় শিক্ষকরা ছাত্রদেরকে অবশ্যই তা তালিম দিয়ে থাকেন।

ইসলামের নবী (সা.) খুব সংক্ষেপে, কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা আমাদের শিখিয়ে গেছেন। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন, বান্দা যখন কোনো কাজ করে বা কোনো বিষয় শিখে তা যেন খুব ভালোভাবে করে বা শিখে।’ (তবরানী, আল মুজামুল আওসাত, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা: ২৭৫)।

রাসূল (সা.) এর কথার মর্ম হচ্ছে, একজন ছাত্র ডাক্তারি পোশাক গ্রহণ করলে, তার জন্য কর্তব্য হচ্ছে, উক্ত পেশায় পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করা। কেউ ইঞ্জিনিয়ার হতে চাইলে, উক্ত বিষয়ে সে যেন ভালোভাবে দক্ষতা অর্জন করে। আধা আধা শিখে কোনো কাজ শুরু করা খুবই অন্যায়। একটি প্রবাদ বাক্য আছে, অর্ধেক মোল্লা দ্বীনের জন্য হুমকি আর অর্ধেক ডাক্তার জীবনের জন্য হুমকি।’ তাই  কর্তব্য হলো পূর্ণ দক্ষতা নিয়ে মানুষের সেবা করা।

নিম্নে চিকিৎসা ও চিকিৎসকদের নিয়ে মুসলিম ব্যক্তিবর্গের কিছু সরল কথা তোলে ধরবো। কথা স্বাভাবিক হলেও, এর প্রভাব ও শিক্ষা সুদূর প্রসারী। উদ্দেশ্য, মুসলিম চিকিৎসগণ দ্বীনি দিক থেকেও সচেতন হয়ে যেন দায়িত্ব পালন করেন। চিকিসৎসা শাস্ত্র ও অন্যান্য বিদ্যার মাঝে পার্থক্য হলো, এখানে মানুষের জীবন মরনের প্রশ্ন জড়িত। তাই চিকিৎসা শাস্ত্রের কোনো অসম্পূর্ণতা নিয়ে মানুষের সেবা করা মানে মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা। সনদ থাকার কারণে, ভুল চিকিৎসা করে মানুষ মারলে দুনিয়ার আদালতে হয়তো ছাড় পেয়ে যাবে, কিন্তু বিবেকের দংশন ও আখেরাতের যন্ত্রনাদায়ক শাস্তি থেকে কখনো মুক্তি পাবে না।

রোগীর প্রতি সম্মান দেখানো: রোগীর প্রতি ডাক্তারের যে দায়িত্ব রয়েছে, এর অন্যতম হচ্ছে রোগীকে সম্মান দেখানো। আর প্রত্যেক বিষয়ের সম্মান দেখানোর পদ্ধতি আল্লাদা আলাদা। এক্ষেত্রে সম্মান দেখানোর বিষয় হলো, রোগীর অভিযোগ ও তার কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনা। তার রোগ বা তাকে নিয়ে বিদ্রুপাত্বক কোনো কথা না বলা। রোগীর প্রতি কোনোরূপ তুচ্ছ তাচ্ছিল্য প্রদর্শন না করা। অনেক সময় রোগীর জ্ঞানগত যোগ্যতা বা সামাজিক অবস্থান নিচু হওয়ার কারণে অবজ্ঞা করা হয়। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়। মানুষের মৌলিক অধিকার হচ্ছে তাকে সম্মান দিয়ে কথা বলা। আল কোরআনে বলা হয়েছে, আর মানুষের দিক থেকে অহংকারবশত মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না এবং পৃথিবীতে দম্ভ করে চলো না। নিশ্চয় আল্লাহ কোনো দাম্ভিক, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ রোগী, ডাক্তারের খোশকথা দ্বারা উৎফুল্ল হয়ে অনেক সময় প্রশান্তি অনুভব করে। এটাও রোগীর ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হয়। তাই রোগীকে সম্মান দেখিয়ে কথা বলতে হবে। সওয়াবে পাল্লায় এই কথাও শামিল হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘ভালো ভালো কথা বলাও সদকার অন্তর্ভূক্ত।’ (মুসনাদে আহমদ-৮১১১)।

রোগীর দৃষ্টিতে রোগ দেখা: সমানুভূতি নিয়ে রোগী দেখা। অর্থাৎ রোগী, রোগের কারণে মানসিক ও শারীরিক যতটুকু পেরেশানিতে আছে, এর অনুভূতি ডাক্তারের  মাঝে থাকা। একজন ডাক্তারের কাছে রোগী কী প্রত্যাশা করে, সে অনুযায়ী ডাক্তারের রোগীর প্রতি খেয়াল করা। এ জন্য, কোনো রোগী সরাসরি ডাক্তারের সাক্ষাতে এলে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনা ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো। এ ব্যাপারে কোনো গাফলতি হলে, রোগীর সমস্যা বুঝার ক্ষেত্রে ডাক্তারের অনুভূতি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। (বর্তমানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বলতে হয় না। এক শ্রেণীর অসাধু ডাক্তার, পয়সা কামানোর লোভে প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের পরীক্ষার কথা লিখে দেয়)।

রোগীর কল্যাণ কামনা ও লাভজনক দিককে প্রাধান্য দান: রোগীর অবস্থা বিবেচনায়, তার সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে ডাক্তারের ভূমিকা অগ্রগন্য। সাধারণ মানুষের ভূমিকা এক্ষেত্রে অন্ধের মতো। তাই ডাক্তারকে আমানতদারি রক্ষা করে চলতে হবে। কোনো কিছু ঠিক করে দেয়ার আগে, চিকিৎসা শাস্ত্রের আলোকে এর কার্যকারিতা ও প্রায়োগিক দিকগুলো ভালোভাবে যাচাই করে নিতে হবে। অপ্রচলিত, অগ্রহণযোগ্য কোনো পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। মানহীন কোম্পানির ওষুধ, শুধু কমিশনের লোভে দিলে চিকিৎসা পেশার সঙ্গে এটা হবে এক ধরনের বেঈমানি।

নিম্মোক্ত বিষয়গুলোও রোগীর কল্যাণ কামনার অন্তর্ভূক্ত হবে-

(এক) লিখিত চিকিৎসা পত্র দেয়া। লেখা হবে স্পষ্ট অক্ষরে (আমাদের দেশে অনেকে প্রেসক্রিপশন দেন, যা ফার্মেসিতে নিয়ে যাওয়ার পর পড়া যায় না। এটা কোনো দায়িত্বশীল ডাক্তারের কাজ হতে পারে না)। সেখানে ওষুধের পরিমাণ, ব্যবহারের পদ্ধতি, চিকিৎসা গ্রহণের সময় যে সব বিষয় পরিহার করে চলতে হবে ও ওষুধ ব্যবহারের ফলে সাময়িক যে সব সমস্যা দেখা দিতে পারে তা সুস্পষ্ট অক্ষরে লেখা থাকতে হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত খাঁটি মুমিন হতে পারে না, যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে তা অন্যের জন্য পছন্দ করে না।’ (সহিহ বোখারী-১৩)।

(দুই) রোগ এমন হলে, যা থেকে নিরাময়ের কোনো সম্ভাবনাই নেই তাহলে দায়িত্ব হচ্ছে, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত থাকে সেবা দিয়ে যাওয়া।

(তিন) যে বিষয় নিয়ে পড়া-লেখা হয়েছে, ওই বিষয়ের কোনো রোগী এলে চিকিৎসা দিতে কোনো কার্পণ্য না করা। বরং সামর্থ্যের সর্ব্বোচ্চটা ব্যয় করা। যদি নিজের দ্বারা সম্ভব না হয়, তাহলে কাছের কোনো হাসপাতালে রেফার করা। মনে রাখতে হবে, একজন মানুষের জীবনের মূল্য জগতের কোনো বস্তু হতে পারে না। তাই অবহেলার কারণে কেউ মারা গেলে আল্লাহর কাছে জবাব দিতে হবে। আল্লাহ যেমন অনুগ্রহ করে আমাকে ডাক্তার বানিয়েছেন, আমারও কর্তব্য হলো মানুষের ওপর ইহসান করা।

(চার) রোগীর সার্জারি বা অপারেশন উপযুক্ত স্থানে করা। অর্থাৎ অপারেশন থিয়েটারেই অপারেশন করা। এমন যেন না হয়, অপারেশনের জন্য পর্যাপ্ত যোগান নেই, তারপরও অপারেশন শুরু হয়ে গেলো। এটা হবে মানুষ ও মানবতার প্রতি চরম অবহেলা।

(পাঁচ) রিলিজ দেয়ার উপযুক্ত সময় আসার আগে রিলিজ না দেয়া। তবে শারীরিক অবস্থা যদি উন্নত মনে হয় যে, রিলিজ দিলে কোনো সমস্যা হবে না। অনেক অসাধু মেডিকেল কর্তৃপক্ষ টাকার নেশায় সময় পার হয়ে গেলেও রিলিজ দিতে চায় না। আবার অনেক সরকারি হাসপাতাল সময়ের আগেই বের করে দেয়। উভয়টা মানবতার প্রতি চরম অবহেলা।

রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা করা: পরীক্ষা ও রোগ চিহ্নিত করা ও চিকিৎসার জন্য, রোগীর গোপনাঙ্গ দেখা জায়েজ হবে। গোপনাঙ্গ বলতে বুঝানো হয়েছে, সতরের অংশ। এক্ষেত্রেও রোগীর অনুমতি নিতে হবে। সেখানকার কোনো বিষয় মানুষের সামনে ফাঁস করে দেয়া, অমার্জনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচ্য হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের দোষ গোপন করবে আল্লাহ তায়ালা তার দোষ দুনিয়া ও আখেরাতে গোপন রাখবেন।’(সুনানে আবু দাউদ-৪৮৯৩)। যেখানে দোষকে গোপন করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, সেখানে দোষ নয় বরং বাধ্য হয়ে চিকিৎসার স্বার্থে নিজের কোনো বিষয় চিকিৎসকের সামনে প্রকাশ করলো আর ডাক্তার সাহেব তা মানুষের সামনে প্রকাশ করে তাকে সামাজিকভাবে হেয় করলো তাহলে এর কি কোনো বিচার হবে না?

রোগী চিকিৎসা করাতে অনীহা প্রকাশ করলে চিকিৎসকের করণীয়: রোগী চিকিৎসা করাতে অনীহা প্রকাশ করলে বা বিরত থাকতে চাইলে ডাক্তারের কিছু করণীয় আছে। চিকিৎসা না করলে ভবিষ্যতে কী কী সমস্যা হতে পারে তা রোগীকে বুঝানো। রোগ বিস্তারের ভয়াবহ দিকগুলো তার সামনে তোলে ধরা। তবে এক্ষেত্রে অতিরঞ্জিত হয় এমন কিছু না বলা। সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, রোগীর অনুমতি নিয়ে চিকিৎসা করা। তবে রোগ যদি সাধারণের জন্য ঝুঁকির কারণ হওয়ার মতো হয় তাহলে বিশেষ কারণে অনুমতি ছাড়াই চিকিৎসা হতে পারে। রোগীর মৌখিক সম্মতিও অনুমতি হিসেবে ধর্তব্য হবে। কোনো চিকিৎসা গ্রহণে রোগী অনীহা প্রকাশ করলে, যদি এর বিকল্প থাকে তাহলে চিকিৎসকের দায়িত্ব হলো তাকে বিকল্পটা বলে দেয়া। একটার মধ্যে আটকে রেখে মানসিক চাপে ফেলা উচিত নয়।

সংক্রামক রোগের রোগী হলে চিকিৎসকের করণীয়: রোগ আল্লাহর নির্দেশ ব্যতিত কারো শরীর থেকে অন্যের শরীরে সংক্রমতি হতে পারে না। আল্লাহর নির্দেশে কোনো কোনো রোগ একজন থেকে আরেক জনের মাঝে ছড়াতে পারে। তাই এমন রোগ হলে যা ছড়ানোর আশংকা আছে চিকিৎসকের দায়িত্ব হলো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। রোগ নিয়ন্ত্রনে যারা কাজ করে তাদেরকে জানানো।

শুরুতে বলেছি, ইঞ্জিনিয়ার বাড়ী বানাতে ভুল করলে তা সংশোধনের ব্যবস্থা আছে। বিচারক আদালতে রায় ভুল দিলে উচ্চ আদালতে তা সংশোধন হয়ে যাবে। কিন্তু চিকিৎসায় ভুল করলে তা সংশোধনের সুযোগ নেই। এখানে মানুষের জীবন মরনের প্রশ্ন। তাই কোনো অসম্পূর্ণতা নিয়ে রোগী দেখা নয়। যার জন্য সম্পদের যতটুকু হিস্সা আল্লাহ রেখে দিয়েছেন, সে তা পাবেই। তাই চিকিৎসাকে অর্থ কামানোর মাকসাদ না বানানো। মানব সেবার নিয়তে চিকিৎসা সেবা দিলে এর দ্বারা দুনিয়া ও আখেরাত উভয়টি মিলবে। তাই একজন ডাক্তারের উদ্দেশ্য থাকবে মানুষের কল্যাণ সাধন করা। 

ডাক্তারদের কাজের মাঝে এটাও অন্তর্ভূক্ত যে, তারা রোগ কমানোর জন্য ফিকির করবে। মানুষের শিক্ষার কোনো শেষ নেই। বিশেষ করে চিকিৎসার ময়দানে। প্রত্যেক দিন মানব দেহে নতুন নতুন রোগ দেখা দিচ্ছে। তাই প্রত্যেক ডাক্তারের কর্তব্য হচ্ছে নতুন নতুন বিষয় শিখার চেষ্টা করা। কোনো কোনো ডাক্তার রোগী দেখাতেই ব্যস্ত থেকে সময় পার করে দেন। তারা শিখার সুযোগ পান না বা এর জন্য সময় দিতে চান না। এটা কোনো সৃজনশীল মানুষের কর্মপন্থা হতে পারে না।

এই বিভাগের আরো খবর