• বুধবার   ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||

  • আশ্বিন ১৫ ১৪২৭

  • || ১২ সফর ১৪৪২

পিরোজপুর সংবাদ
৪১

ইসলামে আত্মসম্মানবোধের গুরুত্ব

পিরোজপুর সংবাদ

প্রকাশিত: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২০  

আত্মসম্মানবোধ হলো ব্যক্তি নিজে নিজের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা। অহংকার ও আত্মসম্মানবোধ মনে হয় একই বিষয়, কিন্তু প্রকৃত অর্থে দু’টি ভিন্ন বিষয়।

অহংকার ব্যক্তির পতনের কারণ। কিন্তু আত্মসম্মানবোধ ব্যক্তির অনন্য সৌন্দর্য। অহংকারী আল্লাহ তায়ালার ক্রোধের শিকার হয়। পক্ষান্তরে আত্মসম্মানবোধ দ্বারা ব্যক্তির সম্মান বৃদ্ধি পায়। এই দু’টি বিষয়ের বিপরীত রয়েছে আরো দু’টি বিষয়। একটি হচ্ছে বিনয়। অহংকারের বিপরীতে মানুষের ভালো গুণ হলো বিনয়। আর আত্মসম্মানবোধের বিপরীতে রয়েছে নিজের ব্যক্তিত্বকে হেয় প্রতিপন্ন করা। বিনয় মানুষের ভালো গুণ হলেও নিজেকে অন্যের সামনে হেয় প্রতিপন্ন করা খারাপ। বিষয়গুলো কাছাকাছি হওয়ায়, বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হওয়া স্বাভাবিক। কেউ অহংকারী হয়ে নিজেকে মনে করতে পারে আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন ব্যক্তি। কেউ নিজেকে হেয় প্রতিপন্ন করে, ধারণা করতে পারে বিনয়ী। তাই অহংকার ও আত্মসম্মানবোধ, বিনয় ও নিজেকে হেয় প্রতিপন্ন করার মর্ম বুঝতে হবে। এর জন্য ইসলামের নির্দেশিত পন্থা হচ্ছে বুজুর্গদের সংশ্রবে থাকতে হবে। তাহলেই প্রকৃত বিষয় আস্তে আস্তে পরিস্কার হবে।

ইসলাম আল্লাহ তায়ালার দ্বীন। যেখানে ভালো বিষয় অর্জন করা ও খারাপ বিষয় পরিহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। রাসূল প্রেরণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিলো মানুষকে চরিত্রবান বানানো। মানুষের উত্তম চরিত্রের একটি হচ্ছে আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন হওয়া। আত্মসম্মানবোধকে আরবি ভাষায় বলা হয় ‘গাইরত’। গাইরত শব্দের শাব্দিক অর্থ বিদ্রোহ করা, উত্তেজিত হওয়া, জেগে ওঠা ইত্যাদি। ইবনে হাজার আসকালানি বলেন, ‘গাইরত হচ্ছে, কারো জন্য খাস বস্তুতে, অন্যকেউ অংশিদারিত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করায় ওই ব্যক্তির ভেতরে যে উত্তেজনা তৈরি হয় তা। গাইরতের বহিপ্রকাশ সাধারণত ঘটে থাকে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে।’ (ফাতহুল বারি, খণ্ড-৯, পৃষ্ঠা-৩২০)।

স্বামীর গাইরাত বলতে বুঝানো হয়, স্ত্রী যখন নিজের রূপ-লাবন্য, সৌন্দর্য অন্যকারো সামনে প্রকাশ করে বা স্বামীকে বাদ দিয়ে অন্যকোনো পুরুষের দিকে ঝুঁকে পড়ে তখন স্বামীর ভেতর যে উত্তেজনা তৈরি হয়। তদ্রুপ স্ত্রীর ক্ষেত্রেও হতে পারে। স্ত্রীকে রেখে অন্য নারীর দিকে আকৃষ্ট হওয়া দ্বারা স্ত্রীর ভেতরে যে ক্ষোভ জন্মায় তাই নারীর গাইরত বা আত্মসম্মানবোধ।

মুসলমানের গাইরত বা আত্মসম্মানবোধ দু’ধরনের হয়ে থাকে। দ্বীনি আত্মসম্মানবোধ। আল্লাহর হুকুম লংঘন হওয়ার দ্বারা মুমিনের ঈমানে যে জযবা আসে তাকে দ্বীনি গায়রত বলা হয়। হজরত নবী করিম (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পর, হজরত আবু বকর (রা.) তার স্থলাভিষিক্ত হন। তখন চতুর দিকে ফেতনা ছড়িয়ে পড়ে। হজরত আবু বকর (রা.)-কে সবাই পরামর্শ দেন, যেন নরমভাবে পরিস্থিতির মোকাবিলা করা হয়। তখন তার ঈমানি গায়রত বা আত্মসম্মানবোধ জেগে ওঠে। তিনি বলেন, ‘আমি আবু বকর জীবিত থাকবো আর আল্লাহর দ্বীন জমিন থেকে মিটে যাবে তা কখনো হতে পারে না।’ তখন তিনি একাই বাতিলের মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত হয়ে যান। দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে, জাগতিক বিষয়ে গাইরাত। এটাও আল্লাহ তায়ালার কাছে পছন্দনীয়।

আল্লাহ তায়ালার আত্মসম্মানবোধ:

রাসূল (সা.) বলেন, ‘কোনো কোনো সময় মুমিনের আত্মসম্মানবোধ জেগে ওঠে। আর কখনো কখনো আল্লাহ তায়ালার আত্মসম্মানবোধ জেগে ওঠে। আল্লাহ তায়ালার আত্মসম্মানবোধ জেগে ওঠে যখন মানুষ আল্লাহর নিষিদ্ধ হারাম কাজে লিপ্ত হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ২৭৬১)।

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালার চেয়ে আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন কেউ নেই। এজন্য তিনি প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতাকে হারাম করেছেন। আল্লাহ তায়ালার কাছে নিজের প্রশংসার চেয়ে প্রিয় কোনো বস্তু নেই। তাই তিনি নিজে নিজের প্রশংসা করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর: ৪৬৩৪)।

কিছু শব্দের পরিবর্তনসহ এই হাদিসটি ‘কিতাবুত তাওহিদ’এও বর্ণিত হয়েছে। অন্য হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেন, হে মুহাম্মাদের উম্মত! আল্লাহ তায়ালার চেয়ে আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন সত্তা আর নেই।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৯০১)।

মুহাদ্দিসদেরর মতে আল্লাহ তায়ালার আত্মসম্মানবোধ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার গজব। অর্থাৎ মানুষ যখন আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘন করে অন্যায়, ব্যভিচারে লিপ্ত হয় তখন আল্লাহর ক্রোধের কারণে তাদের ওপর গজব নেমে আসে।

রাসূল (সা.) এর আত্মসম্মানবোধ:

হজরত নবী করিম (সা.) একদিন সাহাবায়ে কেরামের সামনে ব্যভিচারের শাস্তির জন্য সাক্ষ্য-প্রমাণের বিষয়টি আলোচনা করেন। হজরত সাদ ইবনে উবাদা (রা.) তখন বলেন, কাউকে আমার স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচারে পেলে আমি সাক্ষী খুঁজতে যাবো! বরং আমি তাকে তলোয়ারের ধারালো অংশ দিয়ে আঘাত করবো। রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমরা সাদের আত্মসম্মানবোধ দেখে আশ্চর্য হচ্ছো? আল্লাহর কসম, আমি তার চেয়ে বেশি আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন এবং আল্লাহ তায়ালা আমার চেয়ে বেশি।’ (সহিহ মুসলিম, কিতাবুল লিয়ান, হাদিস নম্বর: ৬৩৪০)। 

মিসরের বাদশা মুকাওয়াকিস, রাসূল (সা.) এর দাওয়াতি পত্রের মাধ্যমে ইসলাম গ্রহণ করেন। হাদিয়া হিসেবে সে রাসূল (সা.) এর জন্য একটি দাসী পাঠান। তার নাম ছিলো মারিয়া। রাসূল (সা.) এর সন্তান ইব্রাহিম (রা.) ওই দাসীর গর্ভ থেকেই জন্ম নেন। তার সঙ্গে একজন পুরুষও মিসর থেকে এসেছিলো। সে মারিয়ার ঘরে যাতায়াত করতো। একদিন রাসূল (সা.) তার ঘরে প্রবেশ করেন। মারিয়ার পাশে তখন ওই লোক বসা ছিলো। তা দেখে রাসূল (সা.) এর আত্মসম্মানে আঘাত লাগে। চেহারার রং পাল্টে যায়। তিনি বের হয়ে আসেন। রাস্তায় হজরত ওমর (রা.) এর সঙ্গে সাক্ষাত হয়। হজরত ওমর (রা.) রাসূল (সা.) এর এই অবস্থা দেখে তলোয়ার নিয়ে ওই ব্যক্তিকে হত্যা করতে যান। হজরত জিবরাইল (আ.) এসে মারিয়া ও তার পাশে বসা ব্যক্তির পবিত্রতার সংবাদ দেন। এভাবে সে বেঁচে যায়। (রাওজাতুল মুহিব্বিন, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-২৯৪)। 

রাসূল (সা.) আমাদের জন্য আদর্শ। তার প্রত্যেকটি কাজ, ওঠা-বসা, আচার-ব্যবহার অনুসরণীয়। তিনি নরম স্বভাবের ব্যক্তি হওয়া সত্তেও, নিজের দাসীর সঙ্গেও, অন্য পুরুষের ওঠা-বসাকে মেনে নিতে পারেননি। বরং তিনি তাকে হত্যার অনুমতি দিয়েছিলেন। তাহলে আমরা কীভাবে নিজের স্ত্রীকে অন্য পুরুষের সঙ্গে হাশি-তামাশার জন্য দিতে পারি?

হজরত ওমর (রা.) এর আত্মসম্মানবোধ:

রাসূল (সা.) এর সাহাবাদের মাঝে ওমর (রা.) ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি অন্যায়ের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন। হজরত নবী করিম (সা.) বলেন, ‘একদিন স্বপ্নে আমি জান্নাতে যাই। সেখানে অনেক সুন্দর একটা অট্রালিকা দেখতে পাই। তার পাশে বসে একজন নারী অজু করছিলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, এই অট্টালিকাটা কার জন্য? সে বলে, হজরত ওমরের জন্য। তখন আমার মন চাচ্ছিলো একটু ঘুরে দেখি। কিন্তু হজরত ওমরের আত্মসম্মানবোধ চিন্তা করে আমি বিরত থাকি।’ হজরত ওমর (রা.) রাসূল (সা.) থেকে এই ঘটনা শুনে কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার ব্যাপারে আমার আত্মসম্মানবোধ জেগে ওঠবে! (সহিহ বুখারি, কিতাবু বাদয়িল খালক, হাদিস নম্বর-৪৪০৮)। উক্ত হাদিস দ্বারা বুঝা যায়, বড়দের দায়িত্ব হচ্ছে ছোটদের আত্মসম্মানের দিকে খেয়াল রেখে পদক্ষেপ নেয়া। কখনো এমন পদক্ষেপ নেয়া উচিত হবে না, যা দ্বারা ছোটদের আত্মসম্মানে আঘাত লাগে।

ইসলামের আত্মসম্মানবোধ:

ইসলাম আল্লাহ তায়ালার মনোনীত সর্বশেষ জীবনব্যবস্থা। ইসলামের নির্দেশ হলো, পাপ পঙ্কিলতা মুক্ত পবিত্র জীবন যাপন করা। সে উদ্দেশ্যে কিছু বিধিবিধান দেয়া হয়েছে। কিছু আদেশ নিষেধ জারি করা হয়েছে। যেমন পবিত্র জীবন যাপনের জন্য আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দিয়েছেন, ‘নারীরা যেন নিজেদের সৌন্দর্যকে প্রকাশ না করে। তবে যা প্রকাশ পেয়ে যায় তা ভিন্ন বিষয়। এবং নিজেদের বুকের ওপর উড়না ফেলে রাখে।’ (সূরা: নূর, আয়াত: ৩০)।

মাহরাম আত্মীয় ছাড়া অন্য কারো জন্য নারীদের সঙ্গে মিলিত হওয়ার অনুমতি দেয়নি। রাসূল (সা.) বলেন, তোমরা নারীদের সঙ্গে নির্জনে সময় কাটানো থেকে বিরত থাকো। কেউ প্রশ্ন করলো দেবরের সঙ্গেও? রাসূল (সা.) বলেন, সে নারীর জন্য মৃত্যুর সমতুল্য।’ (সহিহ বুখারি, নিকাহ অধ্যায়, হাদিস: ৪৮৩১)।

মাহরাম আত্মীয় ছাড়া কারো সঙ্গে বাইরে বের হতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসূল (সা.) বলেন, কোনো নারী যেন মাহরাম ব্যতিত সফরের দূরত্বে ভ্রমণে বের না হয়। এক সাহাবি বলেন, আমার স্ত্রীর ওপর হজ ফরজ। তাই সে একা একা হজ আদায় করতে যাচ্ছে। আর আমি ওমুক ওমুক জিহাদে যাওয়ার জন্য নাম লিখিয়েছি। রাসূল (সা.) বলেন, তুমি তোমার স্ত্রীর সঙ্গে হজে যাও।’ (সহিহ বুখারি, কিতাবুল হজ, হাদিস: ১৭১৯)। 

জিহাদ ইসলামে ফজিলতপূর্ণ একটি ইবাদত। তারপরও রাসূল (সা.) ওই সাহাবিকে নির্দেশ দিচ্ছেন, জিহাদ ছেড়ে স্ত্রীর সঙ্গে হজের সফরে যেতে। স্ত্রীকে একা না ছাড়তে। অথচ ওই সময়ের হাজিদের আত্মা ছিলো সব ধরনের পাপ থেকে মুক্ত। নারীরাও ছিলো পবিত্র। তারপরও রাসূল (সা.) এর এই নির্দেশ প্রমাণ করে ইসলামে আত্মসম্মানবোধের গুরুত্ব কত বেশি। আফসোস! আমাদের থেকে আত্মসম্মানবোধ দূর হয়ে যাচ্ছে। সব ধরনের ফেতনার দরজা খোলে দেয়া হচ্ছে। আবার আমরাই নিজের ইজ্জত সম্মান হারিয়ে বিলাপ করছি। রাসূল (সা.) আত্মসম্মানের গুরুত্ব বুঝানোর জন্য বলেন, ‘লজ্জা ঈমানের অংশ।’ কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে, ‘লজ্জা পূর্ণটাই কল্যাণে ভরা।’

বর্তমান সময়ে মুসলমানরা খায়েশাতের পূজায় ডুবে যাচ্ছে। ইসলামের নির্দেশিত পবিত্র জীবন যাপন বাদ দিয়ে, অশ্লীলতা ও নির্লজ্জতায় নিমজ্জিত হচ্ছে। মুসলমান নিজের মূল্যবোধের প্রতি গুরুত্ব না দিয়ে পশ্চিমা সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে। পশ্চিমা সভ্যতার চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন দেখে ধোঁকা খাচ্ছে। অথচ কখনো জানতে চেষ্টা করে না যে, অঢেল সম্পদের মালিক হয়েও সুখ-শান্তি তাদের জীবন থেকে উধাও হয়ে গেছে। পরিবারিক ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়েছে। বিপরীতে অভাবে থেকেও মুসলমানদের মাঝে কিছুটা হলেও শান্তির বাতাস বয়ে যাচ্ছে। পারিবারিক ব্যবস্থা বিদ্যমান রয়েছে।