শনিবার   ২৪ আগস্ট ২০১৯   ভাদ্র ৮ ১৪২৬   ২২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪০

পিরোজপুর সংবাদ
২৩

এসেছে নৃশংসতার সাক্ষী আগস্ট

প্রকাশিত: ১ আগস্ট ২০১৯  

আবার এসেছে ফিরে নৃশংসতার সাক্ষী আগস্ট মাস।  বাঙালির শোকের মাস এটি। 

১৯৭৫ সালের এই আগস্ট মাসের ১৫তারিখ বাঙালির প্রিয় নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সহধর্মিণীসহ পরিবারের প্রায় সকলকেই ঘাতক চক্র নৃশংসভাবে হত্যা করেছিল।শিশু রাসেলকেও কতখানি বর্বর ও নৃশংস হলে এই শিশুটিকেও তারা বাঁচতে দেয়নি। কেবল বঙ্গবন্ধুপরিবার নয়; সেদিন শেখ মনি দম্পতি, আবদুর রব সেরনিয়াবাতকেও হত্যা করেছিল ঘতকরা। এ ছিল এক জঘন্য চক্রান্ত ও গভীর ষড়যন্ত্রের বহির্প্রকাশ। এ কেবল কয়েকজন রজনীতিবিদের হত্যাকাণ্ড নয়, এ ছিল আমাদের জাতীয় ইতিহাসের উল্টোযাত্রার অপপ্রয়াস। এ হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানাই। ঘৃণা জানাই। একই সঙ্গে গভীর শ্রদ্ধায় অবনতচিত্তে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সবাইকে স্মরণ করি।

এ মাসটি আমাদের জন্য দুঃখের, লজ্জা এবং অসহনীয় কষ্টের। আরো একটি নৃশংসতার সাক্ষী এই আগস্ট। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে চালানো হয়েছিল গ্রেনেড হামলা। বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে চালানো ওই গ্রেনেড হামলা থেকে আওয়ামী লীগ সভাপতি অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও ঝরে গিয়েছিল মহিলা আওয়ামী লীগ নেতা আইভি রহমানসহ ২৪ তাজা প্রাণ।

পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাশ্রিত রাজনৈতিক প্রবাহ বা ধারাকে আমূল দিক পরিবর্তনের একটি কুপ্রচেষ্টা ছিল। একই চেষ্টা ছিল ২০০৪সালে। শুধু দিক পরিবর্তন বলি কেন বরং বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দর্শনাশ্রিত গতিধারা চিরতরে রুদ্ধ করে বাংলা ও বাঙালির চিরায়ত রাজনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিরোধী একটি উদ্ভট দর্শন এবং প্রক্রিয়া চালু করবার অপচেষ্টা হয়েছে।

হাজার বছরের শৃঙ্খল ভেঙে বাঙালি জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। পদ্মা-মেঘনা-যমুনা এবং বঙ্গোপসাগরের কূলে কূলে যে জনপদের বাস সেই জনপদের সংস্কৃতির সর্বত্র অনুধাবন এবং আত্মস্থ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। তার রাজনৈতিক চর্চায় তিনি এই জনপদের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিকে জীবন দর্শন হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন। হয়েছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক বাঙালি জাতির।

মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীরা এবং অতিবিপ্লবের শ্লোগানদারীরা তাই অন্তর্জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীদের দেশীয় এজেণ্ডা হিসেবে এই মহানায়ককে নিষ্ঠুর, বর্বরভাবে হত্যা করেছিল। এ শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা নয়, বাংলাদেশের হৃদয়কে কেটে-ছিঁড়ে রক্তাক্ত করা।

পনের আগস্ট পঁচাত্তর সালের সকাল ছিল রাতের চেয়েও অন্ধকার। জাতির সৌভাগ্য সেদিনের সেই নৃশংসতার শিকার থেকে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। এবং এটা বোধ হয় আমাদের জন্য ছিল মহান ঈশ্বরের আশীর্বাদ। শেখ হাসিনা তার পিতার অসমাপ্ত কাজগুলো করতে পারছেন বলেই আজ আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দর্শন, আদর্শকে আঁকড়ে ধরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পথে চলতে পারছি। তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করেছেন এবং বিচার কার্যকরীও করেছেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধ ও মানবাধিকারের শত্রুদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারও সম্পন্ন করে চলেছেন এবং তা কার্যকরীও করছেন। এটা কতিপয় রাজাকারপন্থি ছাড়া সকল মানুষের কাঙ্খিত ছিল।

পঁচাত্তরের পনেরই আগস্টের পর থেকে শোককে শক্তিতে পরিণত করার যে প্রক্রিয়া চলছে সেই শক্তিতেই আমরা একদিন বিশ্বমঞ্চে বাঙালি জাতি হিসাবে শির উঁচু করে দাঁড়াবো। আমাদের অর্থনীতি, সংস্কৃতি, বৈশ্বিক রাজনীতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে অর্জনগুলো প্রমাণ করে শত আঘাতের শত চক্রান্তেও এই ছোট ভূখণ্ডের মানুষ যে মাথা নোয়াবার নয়। ইতিহাসও তাই বলে। প্রতিবছর আগস্ট এসে স্মরণ করিয়ে দেয় এসব নৃশংসতার কথা। মনে পড়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ দিয়ে এর বিচারের পথ পর্যন্ত রুদ্ধ করা হয়েছিল। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসার পর কলঙ্কিত সেই অধ্যাদেশ বাতিল এবং বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার শুরু করা হয়। নানা কূটকৌশলের জাল ছিন্ন করে দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের চূড়ান্ত রায় এবং পরবর্তী সময়ে পাঁচ ঘাতকের ফাঁসি কার্যকর করার মাধ্যমে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করা হয়েছে। তবে পুরো জাতি এখনো প্রতীক্ষার প্রহর গুনছে বঙ্গবন্ধুর বাকি ছয় পলাতক খুনির ফাঁসি কার্যকর করার জন্য।