বৃহস্পতিবার   ১৪ নভেম্বর ২০১৯   কার্তিক ২৯ ১৪২৬   ১৬ রবিউল আউয়াল ১৪৪১

পিরোজপুর সংবাদ
৫০

কবিরা ও সগিরা গুনাহর পরিচয়

প্রকাশিত: ৫ নভেম্বর ২০১৯  

কবিরা ও সগিরা গুনাহর সংজ্ঞা জানার আগে এ কথা বিশদভাবে জেনে নেওয়া বাঞ্ছনীয় যে গুনাহ বলতে সেসব কাজকে বোঝায়, যা আল্লাহর নির্দেশ ও ইচ্ছাবিরুদ্ধ। এতে অনুমান করা যায় যে পরিভাষাগতভাবে যাকে সগিরা গুনাহ বলা হয়, প্রকৃতপক্ষে সেগুলোও ছোট গুনাহ নয়। যেকোনো অবস্থায়ই আল্লাহর নাফরমানি ও তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করা অত্যন্ত কঠিন অপরাধ। তবে কবিরা ও সগিরার যে পার্থক্য, তা শুধু তুলনামূলক। কোনো কোনো মনীষী বলেছেন, স্থূলদৃষ্টিতে ছোট গুনাহ ও বড় গুনাহর উদাহরণ হলো—যেমন ছোট বিচ্ছু ও বড় বিচ্ছু কিংবা আগুনের বড় হল্কা ও ছোট অঙ্গার। এ দুটির কোনো একটির দহনও মানুষ সহ্য করতে পারে না।

কবিরা ও সগিরা গুনাহর পরিচয়

যে গুনাহর জন্য পার্থিব জীবনে হদ বা শাস্তি নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, যেমন—নিরপরাধ মানুষ হত্যা, ব্যভিচার, চুরি ইত্যাদি। কিংবা যে পাপের জন্য পরকালে জাহান্নাম বা আল্লাহর ক্রোধ কিংবা অভিসম্পাতের কারণ বলে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে, যেমন—সুদ খাওয়া, মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া ইত্যাদি। এগুলো কবিরা গুনাহ। আর যেসব পাপের ব্যাপারে কোনো শাস্তি, আল্লাহর ক্রোধ বা অভিশাপের কথা বলা হয়নি; বরং শুধুই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, সেসব হলো সগিরা গুনাহ। তবে সেসব গুনাহও কবিরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত হবে, যার অনিষ্ট ও পরিণতি কোনো কবিরা গুনাহর অনুরূপ কিংবা তার চেয়েও অধিক। আবার যেসব ছোট গুনাহ নির্ভয়ে করা হয় কিংবা নিয়মিতভাবে করা হয়, সেগুলোও কবিরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত হবে।

কবিরা ও সগিরা গুনাহর মধ্যে পার্থক্য

প্রথমত, কোনো গুনাহর প্রাথমিক পর্বগুলো হলো সগিরা গুনাহ। আর ওই গুনাহর চূড়ান্ত পর্ব হলো কবিরা গুনাহ।

দ্বিতীয়ত, কোনো গুনাহর অনিষ্ট ও পরিণতি যদি কোনো কবিরা গুনাহর মতো হয়, তবে তা কবিরা গুনাহ, অন্যথায় সগিরা গুনাহ।

তৃতীয়ত, ইমাম গাজ্জালি (রহ.) বলেছেন, প্রতিটি গুনাহ তার চেয়ে বড় ও ওপরের স্তরের গুনাহর হিসেবে সগিরা বা ছোট গুনাহ। আবার কোনো গুনাহ তার চেয়ে ছোট ও নিচের স্তরের গুনাহর হিসেবে কবিরা গুনাহ।

কবিরা গুনাহর সংখ্যা কত?

স্থান-কাল-পাত্রভেদে হাদিস শরিফে কবিরা গুনাহ তিন বা চার অথবা সাতটি বলা হয়েছে। আল্লামা জাহাবি (রহ.) তাঁর গ্রন্থ ‘আল-কাবায়ের’-এর মধ্যে বলেছেন, কবিরা গুনাহ ৭০টি।

আল্লামা ইবনে হাজর হাইসামি (রহ.) ‘আয-যাওয়াজের’ নামক গ্রন্থে কবিরা গুনাহ ৪৬৭টি বলে উল্লেখ করেছেন।

আল্লামা মুফতি শফি (রহ.) ‘ইনযারুল আশায়ের’ নামক গ্রন্থে কবিরা গুনাহ ৮৩টি ও সগিরা গুনাহ ১২৬টি বলে উল্লেখ করেছেন।

প্রসিদ্ধ কিছু কবিরা গুনাহ

(১) শিরক করা। (২) মাতা-পিতাকে কষ্ট দেওয়া। (৩) আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা। (৪) ব্যভিচার করা। নিজের স্ত্রী ছাড়া অন্য কোনো নারী বা নিজের স্বামী ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন করা। (৫) চুরি করা। (৬) অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা। (৭) মিথ্যা অপবাদ ও মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। (৮) পণ্যে ভেজাল মিশ্রিত করা। (৯) অঙ্গীকার ভঙ্গ করা। (১০) মিথ্যা বলা ও ধোঁকা দেওয়া।

(১১) খাদ্যদ্রব্য গুদামজাত করে রাখা। (১২) মাপে কম দেওয়া। (১৩) অন্যায়ভাবে কারো জমি দখল করা। (১৪) শ্রমিকের মজুরি কম দেওয়া বা না দেওয়া। (১৫) জুয়া খেলা ও লটারি ধরা। (১৬) নেশাজাতীয় দ্রব্য খাওয়া বা পান করা। (১৭) সুদ খাওয়া। (১৮) ঘুষ খাওয়া। (১৯) চাঁদাবাজি বা জোর-জুলুম করে অর্থ-সম্পদ লুটে নেওয়া। (২০) অনাথ, এতিম ও বিধবার সম্পদ গ্রাস করা।

(২১) আমানতের খিয়ানত করা। (২২) অহংকার করা, অন্যকে হেয় করা। (২৩) কোনো মুসলমানকে গালি দেওয়া। (২৪) নিজের স্ত্রী, কন্যা, বোন ও অন্য অধীন নারীদের পরপুরুষের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করতে দেওয়া। (২৫) স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে তাকে নিয়েই ঘর-সংসার করতে থাকা। (২৬) চোগলখুরি করা। (২৭) গিবত-পরনিন্দা তথা কারো অগোচরে তার বদনাম করা, যদিও তা সত্য হয়। (২৮) প্রতিবেশীকে কষ্ট দেওয়া। (২৯) অসৎ কাজ দেখে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও বাধা না দেওয়া। (৩০) তাকদিরের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস না রাখা। (৩১) অবহেলা করে নামাজ কাজা করা, রোজা না রাখা, জাকাত না দেওয়া ও হজ ফরজ হওয়া সত্ত্বেও আদায় না করা।

(বুখারি, হাদিস : ৬৮৫৭, ফাতাওয়া আলমগিরি : ৩/৫৩২, আদ্দুররুল মুখতার : ১/৫৬০, মিরকাত : ১/২২১, কামুসুল ফিকহ : ৪/৫৪৯)

পাপের শাস্তি দুনিয়ায়ও ভোগ করতে হয়

এক শ্রেণির মানুষের বদ্ধমূল ধারণা হলো, পাপের সাজা শুধু পরকালেই দেওয়া হয়। অথচ কোরআন-হাদিসের বহু স্থানে স্পষ্ট করে বলা আছে যে পাপাচারের শাস্তি দুনিয়ায়ও পেতে হয়। মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন, ‘(আখিরাতের) গুরু শাস্তির আগে (দুনিয়ায়ও) তাদের আমি লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা : সাজদা, আয়াত : ২১)

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের যে বিপদ-আপদ ঘটে, তা তো তোমাদের কৃতকর্মেরই ফল...।’ (সুরা : শুরা, আয়াত : ৩০)

আবদুল্লাহ বিন ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়েছেন। অতঃপর তিনি ইরশাদ করেছেন, ‘হে মুহাজিররা, আমি আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি, যেন তোমরা পাঁচটি বিষয়ে আক্রান্ত না হও। তা হলো, কোনো সম্প্রদায় অশ্লীল কাজ প্রকাশ্যে করলে তাদের মধ্যে মহামারি ও এমন রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটবে, যা এর আগে কখনো হয়নি। ওজন ও পরিমাপে ত্রুটি করলে তারা দুর্ভিক্ষ, মূল্যস্ফীতি ও শাসকের অত্যাচারের সম্মুখীন হবে। জাকাত আদায় না করলে তারা বৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হবে। দুনিয়ায় চতুষ্পদ জন্তু না থাকলে তারা বৃষ্টি লাভ করত না। আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অঙ্গীকার ভঙ্গ করলে তাদের ওপর আল্লাহ তাআলা বাইরের এমন শত্রু চাপিয়ে দেবেন যে তাদের সব সম্পদ আত্মসাৎ করবে। তাদের শাসকরা আল্লাহর কিতাব তথা কোরআন ও আল্লাহর অবতীর্ণ দ্বিনের আলোকে শাসনকার্য পরিচালনা না করলে আল্লাহ তাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ তৈরি করে দেবেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪০১৯)

মহান আল্লাহ আমাদের পাপমুক্ত জীবন যাপন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।