রোববার   ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২৪ ১৪২৬   ১০ রবিউস সানি ১৪৪১

পিরোজপুর সংবাদ
১৩৮৪

নবী শিক্ষায় গড়ে তুলুন আপনার শিশুকে

প্রকাশিত: ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮  

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদিস থেকে উল্লেখ করা হয়েছে। ‘তোমাদের সন্তানাদিকে নামাজের শিক্ষা দাও।’ এখানে তাদের নামাজ শিক্ষা দিতে বলেছেন, যখন তারা সাত বছরের শিশু ছিল।
উল্লিখিত বয়সে শিশুদের নামাজের শিক্ষা দেবে নির্দেশমূলকভাবে অথবা এর পূর্বে সৌজন্য মূলকভাবে। যদি শিশু এটা বুঝতে পারে তাহলে ওদের ওজুর পদ্ধতি শিক্ষা দেবেন। ওজু ভঙ্গের কারণও জানিয়ে দেবেন। যেমনিভাবে ওদের নামাজ ও প্রত্যেক নামাজের রাকাত সংখ্যা, নামাজের পদ্ধতি ও সময় সম্পর্কে শিক্ষা দিবেন। নামাজ ভঙ্গের কারণও জানিয়ে দেবেন। তাদের সহজ জিকির ও দোয়াসমূহ মুখস্থ করাবেন।

শিশুদের জামাত, জুমার খুতবা, তারাবি ও দুই ঈদের নামাজে উপস্থিত হওয়ার প্রতি অনুপ্রাণিত করবেন। একাজে অভ্যস্ত করার জন্য তাদেরকে সঙ্গে করে মসজিদে নিয়ে যাবেন। শিশুর বয়স দশ বছরে পৌঁছলে এ ব্যপারে কঠোরতা আরোপ করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই শৈথিল্য প্রদর্শন করা যাবে না। এমনকি এরপরও যে শিশু নামাজে অলসতা দেখাবে তাকে শিষ্টাচার শিক্ষা ও তিরস্কার করার জন্য প্রহার করা যাবে।

যেমনিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বিছানা পৃথক করে দিতে নির্দেশ করেছেন। যেন প্রত্যেকের জন্য আলাদা বিছানা হয়। বাড়ি যদি প্রশস্ত হয় তাহলে ছেলেদের জন্য আলাদা কক্ষ ও মেয়েদের জন্য আলাদা কক্ষের ব্যবস্থা করবে। তার মধ্যে অবশ্যই প্রত্যেকের জন্য ভিন্ন বিছানা হতে হবে। বিছানা পৃথক করার নির্দেশও এক প্রকারের সতর্কতামূলক পরিচর্যা যা সংশ্রবের ক্ষতিকর বিষয় হতে রক্ষা করবে।

এখানে এদিকেও ইঙ্গিত রয়েছে যে, কন্যা শিশু ও ছেলে শিশুর এই বয়সে যদি বয়ঃসন্ধি ঘটে যায় তাহলে একই বিছানার সংশ্রবের দরুণ ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। এই বয়ঃস্তরে যে বিষয়টির ওপর একান্তভাবে সতর্ক করা উচিত তা হলো; কন্যা তার ভাইদের সামনে আঁটসাট পোশাকে বের হবে না। যথা- স্কার্ট পরিধান করা অথবা স্কন্ধ ও বাহুযুগল উম্মুক্ত রাখা, উরুযুগল ও পেট খুলে রাখা ইত্যাদি। এ বয়সে কন্যা শিশুটিকে দৃষ্টি অবনমিতো রাখতে ও অপরের গোপন অঙ্গ স্পর্শ ও তার দিকে না তাকানোর শিক্ষা দেবে।

শিশুকে আত্ম সংশোধনের শিক্ষা:

শরিয়তের পরিভাষায় আত্মা সম্পর্কে বেশ আলোকপাত করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা আত্মা সম্পর্কে বলেন,

قَدْ أَفْلَحَ مَنْ زَكَّاهَا . وَقَدْ خَابَ مَنْ دَسَّاهَا

‘নিশ্চয় সে সফলকাম হয়েছে যে নিজের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে। এবং সে ব্যর্থ হয়েছে যে একে কলুষিত করেছে।’ (সূরা আশ শামস: ৯-১০)

তিনি আরো বলেন,

وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى . فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى

‘আর যে স্বীয় রবের সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে নিশ্চয় জান্নাত হবে তার আবুাস স্থল।’ (সূরা আন নাজিয়াত: ৪০-৪১)

এ আয়াতগুলো আত্মার প্রতি যত্ন নেয়ার গুরুত্বকে স্পষ্ট করে দেয়। ফলে আত্মা থেকে দোষত্রুটিকে ‘না’ বলে দেয়া হয়। কথা ও কাজের মাধ্যমে আত্মাকে নির্মল ও পরিশুদ্ধ করার প্রচেষ্টা চালায়। অভিভাবকের জন্য শিশুর বয়োঃপ্রাপ্তি পর্যন্ত অপেক্ষা করা ঠিক নয়। এরপর সে শিশুর আত্মাকে পরিশুদ্ধ ও সমূহ ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে নিষ্কলুষ করবে। তার সামনে স্পষ্ট করে তুলবে যে, আল্লাহ তায়ালা তার সকল ব্যাপারে অবগত, তার কোনো কিছুই তাঁর কাছে লুকায়িত নেই। কেরামান- কাতেবীন ফেরেশ্তা তার ভালো-মন্দ সকল কর্ম লিপিবদ্ধ করে রাখছেন। সুতরাং তাকে কল্যাণকর কাজের নির্দেশ করবে এবং অন্যায় ত্যাগ ও নিজের আত্মার পর্যবেক্ষণের দিকে আহ্বান জানাবে।

কোরআন তিলাওয়াতে অভ্যস্ত করা:

কোরআনুল কারীম হলো মহামহিমান্বিত প্রজ্ঞাময় আল্লাহ তায়ালার বাণী। যার মধ্যে নিহিত আছে সমগ্র মানব জাতির ইহ-পারলৌকিক সার্বিক কল্যাণ ও সৌভাগ্য। অতীতে ও বর্তমানে কোরআনের মর্যাদা অনুযায়ী মুসলমানগণ আপন নেতৃত্ব গ্রহণ করে নিয়েছে। মুসলিম উম্মাহর কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা ও হৃত গৌরব, আল্লাহর কালাম ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহর আনুগত্য ব্যতীত কখনোই উদ্ধার করা সম্ভব নয়।

সুতরাং কোরআনে কারীম নিজেরা মুখস্থ করা এবং সন্তানদের তা মুখস্থ করানো আমাদের কর্তব্য। আধুনিক পাঠ্যক্রম প্রমাণ করেছে যে, এ বয়সে শিশুর স্মরণ শক্তি অত্যন্ত প্রখর থাকে। অতএব অভিভাবকদের শিশুদের এই সামর্থ্যকে কোরআনে কারীম হেফ্জ করা ও অধিকাংশ মুসলিম দেশসমূহে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তাহফিজুল কোরআনের আসরে তাদের অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে উত্তমরূপে কাজে লাগাতে হবে।

শিশু যেটা হিফজ করতে চায় তা কয়েকবারের বেশি তাকে পুনরাবৃত্তি করতে হয় না। এমনি করে সে আল্লাহর ইচ্ছায় হাফেজে কোরআন হয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে একটি প্রসিদ্ধ প্রবাদও রয়েছে। ‘শৈশবের শিক্ষা যেন পাথরে অংকন করা।’

অতীতে ও বর্তমানে এমন অসংখ্য হাফেজ রয়েছে যারা শৈশবকালেই কোরআন হেফ্জ করতে সক্ষম হয়েছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘তাফসীর সংক্রান্ত বিষয়ে আমাকে প্রশ্ন করো। কারণ আমি কোরআন কারীম হেফ্জ করেছি যখন আমি ছোট ছিলাম।’

ইমাম বুখারী (রহ.) তার গ্রন্থে এ বিষয়ে একটি অধ্যায় রেখেছেন। তার শিরোনাম করেছেন, ‘শিশুদের কোরআনে কারীম শিক্ষা দান।’ কোরআনুল কারীম হেফজের দ্বারা শিশুর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। এমনকি সে নামাজে জামাতে অগ্রগামী হয় ও অনেক বড় বড় শায়খদেরও ইমামতি করে যদি তার হিফজের পরিপক্কতা তাদের চেয়ে বেশি হয়। যেহেতু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের বলেছেন, ‘তোমাদের ইমামতি করবে যে তোমাদের মধ্যে বেশি কোরআন সম্পর্কে জানে।’

উমার বিন সালিমাহ (রা.) তার সম্প্রদায় সম্পর্কে বলেন, ‘তারা লক্ষ করে দেখলেন আমার থেকে বেশি কোরআন সম্পর্কে অভিজ্ঞ কেউ নেই। কারণ আমি অশ্বারোহীদের (মুসলিম যোদ্ধা) কাছে কোরআন শিখেছিলাম। অতএব ইমামতির জন্য তারা আমাকেই সামনে পাঠাল। অথচ আমি তখন ছয় অথবা সাত বছরের শিশু মাত্র।’

অতিরঞ্জন ও শিথিলতা পরিহার:

প্রশংসা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন অথবা অনুপ্রেরণা- এগুলো শিশুর প্রতিভা বিকাশে বিশাল ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু এক্ষেত্রে অনেক অভিভাবক ভুল পথে চলেন। যখন তারা অনুভব করেন অথবা ধারণা করেন যে, শিশুটি তার প্রতিশ্রুত কাজটি করতে পারবে না। অথবা যখন সে প্রত্যাশা বাস্তবায়নে শৈথিল্য প্রদর্শন করে তখন তারা তাকে বলে, তুমি একটা গবেট, একটা অথর্ব অথবা একটা অলস ইত্যাদি। বা তোমার মতো লোক কোনো কাজে সফল হতে পারে না অথবা এজাতীয় অন্য কোনো কথা।

যদিও বা কখনো এর দ্বারা অভিভাবকের উদ্দেশ্য শিশুকে উক্ত কর্ম ও কর্মে উৎকর্ষ সাধনে উৎসাহিত করা। কিন্তু তা সত্ত্বেও এটা ভুল পদ্ধতি, কারণ অদূর ভবিষ্যতে অভিভাবক তাকে যে অভিধায় অভিষিক্ত করেছেন সে বাস্তবে সেই কর্মটি সম্পাদনেই উদ্যত হয়ে থাকবে। কারণ অভিভাবক তার বাহু ভেঙ্গে ফেলেছেন ও তার সঙ্গে নেতিবাচক বিষয় সংযোজন করে দিয়েছেন। ফলে সে ঐ কর্মটি সম্পাদনের কখনই চিন্তা বা সংকল্প করবে না। যদি সে চেষ্টা করতো হয়ত বা তার প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ ও সফল হতে পারতো।

ক্ষমা ও উদারতার শিক্ষা দেওয়া:

যে সব নান্দনিক চরিত্রে শিশুকে প্রতিপালিত করা উচিত তার অন্যতম হলো ক্ষমা ও উদারতা। এর তাৎপর্য বর্ণনায় কোরআন ও হাদিসের অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে। একদিকে কোরআনুল কারীমের বক্তব্য যেভাবে ধৈর্য ও ক্ষমার প্রশংসা করেছে। যেমন: আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

فَمَنْ عَفَا وَأَصْلَحَ فَأَجْرُهُ عَلَى اللَّه

‘যে ক্ষমা করে দেয় ও আপোস নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর নিকট আছে।’ (সূরা আশ শুরা: ৪০)

আল্লাহ তায়ালা আরো ইরশাদ করেন:

وَلَمَنْ صَبَرَ وَغَفَرَ إِنَّ ذَلِكَ لَمِنْ عَزْمِ الْأُمُور

‘অবশ্য যে ধৈর্য ধারণ করে এবং ক্ষমা করে দেয়, নিশ্চয় তা দৃঢ় সংকল্পেরই কাজ।’ (সূরা আশ শুরা: ৪৩)

আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন,

وَلَمَنِ انْتَصَرَ بَعْدَ ظُلْمِهِ فَأُولَئِكَ مَا عَلَيْهِمْ مِنْ سَبِيلٍ

‘অত্যাচারিত হওয়ার পর যারা প্রতিবিধান করে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না।’ (সূরা আশ শুরা: ৪১)

শরিয়তের প্রমাণ তারই প্রশংসা করে, যে অত্যাচারীর প্রতিবিধান করে। আল্লাহ তায়ালা ঈমানদারদের প্রশংসায় বলেন,

وَالَّذِينَ إِذَا أَصَابَهُمُ الْبَغْيُ هُمْ يَنْتَصِرُونَ

‘এবং যারা অত্যাচারিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করে।’ (সূরা আশ শুরা: ৩৯)

আলেমদের বৈঠকে বসানো:

অনেক মানুষ আছেন যারা অবুঝ শিশুদের প্রতি যতটুকু লক্ষ রাখেন এই বয়সের শিশুদের প্রতি ততটুকু করেন না। ফলে তাদের আলেম-উলামা ও বড়দের মজলিসে যেতে বারণ করে থাকেন। শিক্ষামূলক সেমিনারে উপস্থিত হতেও নিষেধ করেন তা ধারণ করতে তাদের অসমর্থতার আশঙ্কায়। যখন মজলিসে কাঙ্ক্ষিত অতিথি শুভাগমন করেন তখন বুঝমান শিশুদের মজলিস থেকে বের করে দেয়া হয় এবং তাদের সাক্ষাৎকার থেকে শিশুদের বিরত রাখা হয়।

অনেকে তো খুবই অতিরঞ্জন করে ফেলেন। শিশুদের একটি কক্ষের মধ্যে বন্দি করে অতিথি বের হওয়া পর্যন্ত তালাবদ্ধ করে রাখেন। এগুলো সবই স্বাভাবিকতার ওপর অতিরঞ্জন। সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, এতো কিছুর পরও তারা এটাকে শিষ্টাচার হিসেবে গণ্য করে। বরং প্রকৃত শিষ্টাচার ও সঠিক তৎপরতা হলো অভিভাবক শিশুদের এ জাতীয় মজলিসে উপস্থিত হওয়ার জন্য সুযোগ করে দেবেন। ফলে তারা সেখান থেকে কথা বলার শিষ্টাচার শিক্ষা করতে পারবে। শিখতে পারবে মজলিসের আদব ও শ্রবণ করার আদব।

ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ করা:

শিশুকে ‘এটা একটা ভালো ও সময় উপযোগী কাজ’ এ জাতীয় কথা বলা গ্রহণযোগ্য ছিল। কারণ সেটা মা-বাবার নিকট পছন্দনীয় কাজের অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু কিশোর বয়সে এসে শরিয়তের পরিভাষাগুলো প্রয়োগ করা উচিত। কারণ এটাই তাকে পৌরুষ স্তরের যোগ্য করে তোলার মাধ্যম। তখন বলতে হবে এটা হালাল ও এটা হারাম, ওটা মুস্তাহাব ও ওটা মাকরুহ ইত্যাদি।

এর প্রমাণস্বরূপ একটি আয়াত ও একটি হাদিস উল্লেখ করা যেতে পারে শিশুকে শরিয়তের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে। যাতে বিষয়গুলো অভ্যাস ও সামাজিক প্রচলনের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে শরিয়তের গণ্ডির মধ্যে অনুপ্রবেশ করতে পারে। ফলে সে কাজগুলোর তাৎপর্য ও মর্যাদা অর্জিত হয়ে যাবে। ফলে আল্লাহর আইন ও তার দ্বীনের মহত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে ও প্রকারান্তরে বয়ঃসন্ধি স্তরের জন্য শিশুকে তৈরি করাও হয়ে যাবে।

এই বিভাগের আরো খবর