• সোমবার   ০৬ জুলাই ২০২০ ||

  • আষাঢ় ২২ ১৪২৭

  • || ১৫ জ্বিলকদ ১৪৪১

পিরোজপুর সংবাদ
১০৭

বাংলাদেশের এই ঘাট দিয়ে ফেরিতে চলতো রেল!

পিরোজপুর সংবাদ

প্রকাশিত: ২৩ জুন ২০২০  

যমুনা নদীতে ট্রেন পার হতো ফেরিতে! কি অবাক কাণ্ড। কখনও দেখেছেন রেলওয়ে ফেরি? এমনই ফেরির ইতিহাস সাক্ষী রয়েছে বাহাদুরাবাদ ফেরি ঘাট।। ১৯৩৮ সালে এই রেলওয়ে ফেরি চালু হয়। যার নাম দেওয়া হয় ‘বাহাদুরাবাদ রেল ফেরি ঘাট’। রেলে ফেরি পারাপার এটাও সম্ভব! কৌতূহল আর জনমুখে ছড়িয়ে পড়ল মুহূর্তে বাহাদুরাবাদ খ্যাতি অর্জন করল। আলোচিত ও ঐতিহ্যবাহী বাহাদুরাবাদ ইউনিয়নের নাম ছড়িয়ে পড়ল দেশে ও বিদেশে। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে রয়েছে এই ঘাট।

বলা যায়, বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম হল বাহাদুরাবাদ। কেন এমন নাম তার ইতিহাসও রয়েছে।১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের সময় বিদ্রোহীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে শেষ বিদ্রোহী নেতা সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের নামানুসারে এই এলাকার নামকরণ করা হয় বাহাদুরাবাদ।

শুধুমাত্র দেশেই নয়, একসময় এর পরিচিতি ছিল বিশ্বজুড়েই। বাহাদুরাবাদের বিশ্বখ্যাতি এনে দিয়েছিল একমাত্র এই ফেরি ঘাটটিই। একসময় বাংলাদেশের নৌ-থানার অন্তর্গত ছিল ৪টি ফেরি ঘাট। আর ২টি রেলওয়ে ফেরি ঘাটের মধ্যে একটি ছিল এই বাহাদুরাবাদ।

এবার আসুন একটি জেনে নেওয়া যাক বাহাদুরাবাদের বাহাদুরির কাহিনী...

১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ সরকার ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য চালু করেছিলে বাহাদুরাবাদ রেল ফেরি। তখন একপাড় বাহাদুরাবাদ ঘাট অন্য পাড়ে গাইবান্ধার তিস্তা পাড় ঘাট। তিস্তামুখ ঘাট ও জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জের বাহাদুরাবাদ ঘাটে যমুনা নদিতে রেল ফেরির সার্ভিস চালু করা হয়। তৎকালীন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর রংপুর জেলার গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও জেলা-সহ বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে যাত্রী ও মালপত্র পারাপারের জন্য এই ফেরি সার্ভিসটি চালু করে।
    
ক্রমেই তা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৯০ সালের পর যমুনা নদীর নাব্যতা সঙ্কটের কারণে ফেরি সার্ভিসটি তিস্তামুখ ঘাট থেকে বালাসি ঘাটে স্থানান্তর করা হয়। বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের আগে দিনাজপুর থেকে রংপুর হয়ে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার বালাসিঘাট পর্যন্ত ট্রেনে যাতায়াত করতেন এই অঞ্চলের মানুষজন। এছাড়াও সান্তাহার, বগুড়া, বোনারপাড়া হয়েও ট্রেনেই এই ঘাট দিয়ে মানুষ চলাচল করতেন। তবে বঙ্গবন্ধু সেতু চালুর পর থেকে লোকাল ট্রেন, মেল ট্রেন বন্ধ করে দেওয়া হয়। তবে কিছুদিন মালবাহী ওয়াগন চালু করা হয়। সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।

পরিবর্তিতে নৌ চ্যানেলের সঙ্গে তাল মিলিয়ে রেলওয়ে ফেরি ঘাটেরও স্থান পরিবর্তন শুরু হয়। উত্তরাঞ্চলের এই ঘাটটি তিস্তামুখ, ফুলছড়ি, অবশেষে বালাসি ঘাট নামে রেলওয়ে ফেরিঘাট হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

১৯৮৮ সালে বন্যায় বালাসি ও বাহাদুরাবাদ দু’টি ঘাটেরই মূল নকশা বদলে যায়। নদীর নাব্যতা সঙ্কটের কারণে বারবার ঘাটের কাঠামো পরিবর্তন ও তার ব্যয়ভার রেলওয়ের বার্ষিক বাজেটের ওপরেও প্রভাব ফেলে।১৯৯০ সালের দিকে যমুনা নদীর নাব্যতা কমে এলে ওপাড়ের ঘাটের নতুন ঠিকানা হয় গাইবান্ধার বালাসিতে। এই দুই ঘাটেই ভীড়তো বড় বড় জাহাজ, লঞ্চ, স্টিমার-সহ নানা নৌযান। অসম-বেঙ্গল রেলওয়ের অধীনে এই রেলওয়ে ফেরি সার্ভিসটি যাত্রা শুরু করেছিল। ফেরির লাইনের সংখ্যা ছিল ১৩টি এবং এক একটি লাইনে ৩টি করে বগি বা ওয়াগন নেওয়ার ক্ষমতা ছিল।


১৯৮৯ থেকে ২০০৪ পর্যন্ত স্থায়ীভাবে বালাসি বাহাদুরাবাদ ঘাটের মধ্যে রেলওয়ে ফেরি পারাপারে অন্যতম মাধ্যম ছিল। এর মাধ্যমে তিস্তা ও একতা এক্সপ্রেস ট্রেন দু’টি যমুনার উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম তীরের রাজশাহী, রংপুর বিভাগের যাত্রাপথে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এছাড়াও পূর্ব তীরের সিলেট, ময়মনসিংহ ও ঢাকা বিভাগের একমাত্র সহজ ও স্বল্পব্যয়ী রেলওয়ের যাতায়াত রুটে পরিণত হয়। তবে যমুনা ও তিস্তা নদীর নাব্যতা এতটাই নীচে নামত যে, নদী পথে মাত্র ৪ মাস ফেরি চলাচল করা সম্ভব হয়। স্থানীয় নৌকাগুলিও পারাপার বন্ধ করে দেয়।

এই ফেরি ঘাট দিয়ে একতা ও তিস্তা এক্সপ্রেস ট্রেনে প্রতিদিন উত্তরাঞ্চল হতে হাজার হাজার মানুষ রাজধানী ঢাকার সঙ্গে চলাচল করত। গ্রীষ্মকালে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় স্টিমার ও ফেরিগুলো চোরাবালিতে মাঝ নদীতে আটকে পড়তে থাকে। ফলে বালাসী ঘাটে ঢাকা ও দিনাজপুরগামী ট্রেনের যাত্রীরা নৌকা দিয়ে পারাপার শুরু করে। পরে বঙ্গবন্ধু সেতুতে রেলপথ বসানোর কাজ শেষ হওয়ায় ১৪/১৫ জুলাই ২০০৫ সালে। রেলওয়ে বিভাগ বালাসী বাহাদুরাবাদ রেলওয়ে ফেরি পারাপার বন্ধ করে যমুনা সেতুর উপর দিয়ে রেল চলাচলের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে উত্তারাঞ্চলের জেলা গুলোর সঙ্গে সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের দ্রুত যোগাযোগের মাধ্যম এই রেল ফেরি পরিষেবা চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। সবথেকে অভাবনীয় বিষয়টি হল বাহাদুরাবাদ এক্সপ্রেস নামে একটি ট্রেনও চালু করা হয়েছিল।

এখনও বহু স্মৃতি আগলে বাহাদুরাবাদ ঘাট রয়েছে ঠিকই। তবে অতীতের সেই জৌলুস এখন আর নেই। বাদাদুরাবাদের ধ্বংসস্তূপের ফেরি ঘাট আজও তাকিয়ে। নদীর স্রোত বয়ে যায়। ভাঙা-গড়ার খেলায় জোয়ার-ভাটার স্রোত বয়ে যায় কিন্তু বাদাদুরাবাদের ফেরিতে কারও পা পড়ে না।

নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে  ফেরি চলাচল কার্যক্রম ২০১৫ সাল থেকে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে। নিয়মিত ডগিং না হওয়ায় অকার্যকর হয়ে পড়ে আছে ১১ টি জাহাজ। আছে  এখনও টিকে আছে ফেরিঘাটের সব স্থাপনা। ফেরি বন্ধ হয়ে গেছে, তবে এখনও রয়ে গেছে মেরিন সুপারিন্টেন্ডেন্ট এর পদ। নদীতে পড়ে আছে শত শত কোটি টাকার সম্পদ। ফেরিঘাটে প্রায় ৫০০ কর্মচারীকে কাজে লাগানো হচ্ছে রেলের বিভিন্ন বিভাগে। তবে অধিকাংশ শ্রমিক আর কর্মচারী এখনও আগের পদেই রয়ে গেছেন, অপেক্ষা করছেন অন্য কোন বিভাগে কাজে বদলি হওয়ার। এখন অলস শুয়ে বসে সময় কাটে এক সময়ের কর্মব্যস্ত ফেরিঘাটের রেল কর্মচারীদের।

রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার রাসেল আলম যিনি এখন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে রেলওয়ের মেরিন সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তিনি জানান, পর্যায়ক্রমে ফেরিঘাটের স্থাপনা ও অকেজো মালামাল বিক্রি করা হচ্ছে। বাকিগুলোও বিক্রির প্রক্রিয়ায় রয়েছে। যাতে জাহাজ ও ফেরিঘাটের সম্পদ নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখছেন তারা। ফেরি সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বিভিন্ন বিভাগে বদলি করে কাজে লাগানো হচ্ছে। মালামাল পাহারা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বালাসীঘাটে কিছু কর্মচারী আছে সম্পূর্ণরূপে স্থাপনা সমূহ বিক্রি হয়ে গেলে বাকিদেরও রেলের বিভাগে বদলি করা হবে।

ইত্যাদি বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর