রোববার   ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯   অগ্রাহায়ণ ২৪ ১৪২৬   ১০ রবিউস সানি ১৪৪১

পিরোজপুর সংবাদ
৫২

মৃত্যুদণ্ড পাওয়া কয়েদিদের ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যান যে সন্ন্যাসিনী

প্রকাশিত: ৪ নভেম্বর ২০১৯  

 

উনিশশো একাশি সালে সিঙ্গাপুরের একজন ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী মৃত্যুদণ্ড পাওয়া এক নারী কয়েদির সাথে চিঠি বিনিময় শুরু করেন। এই পত্রালাপ চলতে থাকে পরবর্তী সাত বছর ধরে।

এই নান হলেন সিস্টার জেরার্ড ফার্নান্ডেজ এবং কয়েদি হলেন টান মুই চু। সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে নৃশংস এক হত্যাকাণ্ডের মামলায় টান মুই চু'র ফাঁসির আদেশ হয়। সিস্টার জেরার্ড এক সময় টান মুই চু'কে স্কুলে পড়িয়েছেন।

সিস্টার জেরার্ড বলছেন, টান ছিলেন এক সাদাসিধে মেয়ে। ধর্মপরায়ণ এক পরিবার থেকে তিনি কনভেন্ট স্কুলে পড়তে এসেছিলেন।

টান ও তার স্বামী এড্রিয়ান লিম, এবং স্বামীর রক্ষিতা হো কাহ্ হং এর বিরুদ্ধে দুটি শিশুকে হত্যার অভিযোগ প্রমাণিত হয় এবং তাদের সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

"টান জীবনে বড় ধরনের ভুল করেছিল," বলছেন স্বল্পভাষী এই ৮১-বছর বয়সী সন্ন্যাসিনী, "তার খবরটা প্রথম শোনার পর আমার খুব খারাপ লেগেছিল। তখনই আমার মনে হয়েছিল যে করেই হোক তার সাথে দেখা করতে হবে।"

এরপর বেশ কয়েক বছর ধরে সিস্টার জেরার্ড টান মুই চু'র সাথে দেখা করার জন্য কারাগারে যান।

দু'জনে গভীর রাত পর্যন্ত একত্রে উপাসনা করেন। সিস্টার জেরার্ড বলছেন, এর মাধ্যমে দু'জনের মধ্যে একটা আত্মার সম্পর্ক তৈরি হয়। দু'জন পরস্পরকে আরো ভালভাবে বুঝতে পারেন।

"তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়াতেই আমি সেখানে গিয়েছিলাম, এবং সে-ও জানতো সে আমার সাথে মন খুলে কথা বলতে পারতো," বলছেন তিনি, "আমার মনে হয় তার মনের ভেতরের কারাগার থেকে সে মুক্তি পেয়েছিল।"

সিঙ্গাপুরে খুন এবং মাদক-সম্পর্কিত অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

 

টান মুই চু'র ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয় ১৯৮৮ সালের ২৫শে নভেম্বর। তার সাথে সিস্টার জেরার্ডের দেখা হয়েছিল সেদিন সকালে।

"একটা লোক সারা জীবনে অনেক খারাপ কাজ করলেও, তার জীবনের দাম কিন্তু তার চেয়েও অনেক বেশি," বলছেন সিস্টার জেরার্ড, "পাপ যত বড়ই হোক না কেন মর্যাদা নিয়ে মৃত্যুর অধিকার সব মানুষের রয়েছে।"

জীবনের শেষ সকালে টান মুই চু একটি নীল রঙের পোশাক পরেন। তার জুতার রঙও ছিল নীল। "সে দিন সে ছিল বেশ শান্ত," বলছেন সিস্টার জেরার্ড। এরপর এই দুই নারী হাতে হাত ধরে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যান।

"সে যখন ফাঁসির মঞ্চের ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছিল, তার পায়ের শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছিলাম। ফাঁসি কাঠের লিভারটি যখন টেনে ধরা হলো আর ট্র্যাপ ডোরটি যখন ঘটাং করে খুলে দেয়া হলো, সেটা আমি অনুভব করতে পারছিলাম। ঠিক তখনই আমি টের পেলাম সে আমাদের ছেড়ে চলে গেল।"

সিঙ্গাপুরের বিখ্যাত চাঙ্গি বিমানবন্দর থেকে একটু দূরে এই বিশাল চাঙ্গি কারাগার। দেশের সবচেয়ে কুখ্যাত অপরাধী এবং মৃত্যুদণ্ড পাওয়া কয়েদিদের এখানে রাখা হয়।

এই কারাগারেই টান মুই চু'র মতো আরো ১৮ জন কয়েদিকে সিস্টার জেরার্ড ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে গেছেন।

"মৃত্যুদণ্ডের বাস্তবতা আসলে কেউই সহজে স্বীকার করে নিতে পারে না," বলছেন তিনি।

"নিজের ভাগ্যকে মেনে নিতে সময় লাগে। আর এটা স্বীকার করে নিতেও অনেক বেদনা তৈরি হয়।"

সিস্টার জেরার্ড গত ৪০ বছরে ধরে কারাগারের বন্দীদের সাথে কাজ করছেন। তিনি মনে করেন ঈশ্বরই তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন।

সিস্টার জেরার্ড ফার্নান্দেজ, ৮১, সিঙ্গাপুরের টোয়া পেও খ্রিস্টান মঠে বাস করেন।

"ফাঁসির আসামীর অনেক ধরনের মানসিক ও ধর্মীয় সাহায্যের প্রয়োজন হয়," তিনি বলছেন।

"আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি যে ক্ষমা চাইতে পারলে, আর মনের ক্ষত পুষিয়ে নিতে পারলে - তারা মৃত্যুর পর আরো ভাল কোন জায়গায় যেতে পারবে।"

বেশ কয়েক বছর পর আরেকজন পুরুষ বন্দি সিস্টার জেরার্ডের সাথে যোগাযোগ করেন। "তিনি আমাকে বলছিলেন কারাগারে আমার উপস্থিতি তার মনে শান্তি এনে দিয়েছিল।"

সিস্টার জেরার্ড বলছেন, কয়েদিদের ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাওয়াকে তিনি অত্যন্ত সম্মানের কাজ বলে মনে করেন।

"জীবনের চরম মুহূর্তে কেউ যখন তাদের মনের গভীর দু:খগুলো ভাগ করে নেন এবং তাদের হৃদয়ে আমাকে স্থান দেন, তখন সেটা হয় ভালবাসা আর আস্থার সর্বোচ্চ প্রতীক," বলছেন তিনি।

ঐ কয়েদির একটা কথা সিস্টার জেরার্ডের মনে এখনও গেঁথে আছে: "সকালেই আমার সাথে ঈশ্বরের দেখা হবে। তখন তাকে আমি আপনার কথা জানাবো।"

সিঙ্গাপুরের কারা প্রশাসনের অধীনে ১৪টা কারাগার ও মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে। কর্তৃপক্ষ বলছে, বন্দিদের সহায়তার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে রয়েছে এই ধরনের সেবা।

"সিস্টার জেরার্ড একজন স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে আমাদের সাথে ৪০ বছর ধরে কাজ করছেন," একজন মুখপাত্র বিবিসিকে বলছিলেন, "তার নিষ্ঠা, আবেগ, তার ত্যাগী মনোভাব আমাদের সবাইকে অনুপ্রাণিত করে।"

মৃত্যুদণ্ডের ইস্যু নিয়ে সিঙ্গাপুরে বিতর্ক রয়েছে। এখানকার অধিবাসীদের মতামতও বিভক্ত। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই ধনী নগর-রাষ্ট্রটি নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং অপরাধের নিম্ন মাত্রা নিয়ে গর্বিত।

চাঙ্গি কারাগারে আটক বন্দিরা।

সরকার যদিও ২০১২ সালে মৃত্যুদণ্ডের আইনে কিছু পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু সরকারি হিসেবেই দেখা যাচ্ছে ২০১৮ সালে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে।

তবে জনমত জরিপগুলো বলছে, কঠোর আইন-প্রয়োগের প্রশ্নে বড় ধরনের জনসমর্থন রয়েছে।

"মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে জনসমর্থন সাধারণত বেশি," বলছেন কার্সটেন হান। 'উই বিলিভ ইন সেকেন্ড চান্স' নামে এক প্রতিষ্ঠানের তিনি সহ-প্রতিষ্ঠাতা। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামীদের পক্ষে কাজ করে এই প্রতিষ্ঠান।

"মৃত্যুদণ্ডকে দেখা হয় অপরাধ ঠেকানোর উপায় হিসেবে," বলছেন মিজ হান, "এই ধরনের কঠোর আইন-প্রয়োগের প্রতি সিঙ্গাপুরবাসীদের সমর্থনের পেছনে বহু কারণ রয়েছে। কিন্তু এনিয়ে মুক্ত ও খোলাখুলি আলোচনা হয় কমই।"

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মৃত্যুদণ্ডের ঘোর বিরোধী।

এর একজন কর্মকর্তা ফিল রবার্টসন বলছেন, "সহজাতভাবেই এটা এক নিষ্ঠুর প্রথা এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের খোলাখুলি বরখেলাপ।"

"অন্যান্য দেশগুলো যখন একের পর এক মৃত্যুদণ্ড প্রথা রদ করে দিচ্ছে তখন সিঙ্গাপুরের ক্ষমতাসীন পিপলস্ অ্যাকশন পার্টি এই প্রথা চালিয়ে যেতে পারে না।"

"কাউকে মেরে ফেলার ব্যাপারে সরকারের পদক্ষেপের পেছনে আসলে কোন যুক্তি নেই।"

সম্ভবত সেই কারণেই সিস্টার জেরার্ড ফার্নান্দেজ নিজেও মৃত্যুদণ্ডর বিপক্ষে, কারণ "এটা মানুষের জীবন কেড়ে নেয়।"

"প্রতিটা জীবনই অত্যন্ত মূল্যবান," বলছেন তিনি, "আইনের প্রতি আমি শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু তবুও আমি আশা করবো কোন এক সময় মৃত্যুদণ্ড প্রথা উঠে যাবে।"

এই বিভাগের আরো খবর