• মঙ্গলবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||

  • ফাল্গুন ১৩ ১৪৩০

  • || ১৫ শা'বান ১৪৪৫

পিরোজপুর সংবাদ
ব্রেকিং:
জনগণের আস্থা অর্জন করলে ভোট পাবেন: জনপ্রতিনিধিদের প্রধানমন্ত্রী জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে উন্নয়ন কাজের ব্যবস্থাটা আমরা নিয়েছিলাম কেউ যেন ভুয়া ক্লিনিক-চিকিৎসকের দ্বারা প্রতারিত না হন: রাষ্ট্রপতি স্থানীয় সরকার বিভাগে বাজেট বরাদ্দ ৬ গুণ বেড়েছে: প্রধানমন্ত্রী স্থানীয় সরকারকে মাটি-মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়তে হবে শবে বরাতের মাহাত্ম্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে দেশের কাজে আত্মনিয়োগের আহ্বান সমাজের অসহায়, দরিদ্র মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসতে হবে দেশের মানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে বিচারকদের ক্ষমতার অপব্যবহার রোধকল্পে খেয়াল রাখার আহ্বান মিউনিখ সফরে বাংলাদেশের অঙ্গীকার বলিষ্ঠরূপে প্রতিফলিত হয়েছে

সেন্টমার্টিন প্রবাল দ্বীপের ভিন্ন চিত্র

পিরোজপুর সংবাদ

প্রকাশিত: ৫ নভেম্বর ২০২৩  

স্বচ্ছ নীলাভ পানি যখন দূর দিগন্তে আকাশের নীলে মেশে, তা যে কারো মন জুড়াতে বাধ্য। সৈকতজুড়ে সারি সারি কেয়াবাগান, ঝাউগাছ, নারিকেল গাছ, শৈবাল, নুড়ি, পাথর, ঝিনুক আর প্রবালের ছড়াছড়িময় একটি মনোরম দ্বীপের নাম সেন্টমার্টিন। প্রতি বছর অক্টোবর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত যেখানে ছুটে যান দেশ-বিদেশের হাজার হাজার পর্যটক, ফিরতে চান প্রশান্তি আর মুগ্ধতা নিয়ে।

কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার এই দ্বীপে যেতে জাহাজ, ট্রলার আর স্পিডবোটই ভরসা। টেকনাফের দমদমিয়া ঘাট থেকে জাহাজে উঠে গাঙচিল দেখতে দেখতে ভাবছিলাম নীল জলের দ্বীপের বালিয়াড়িতে আমরা হাঁটছি, বেশ সুনসান সাগর সৈকত। এ ভ্রম কাটতে খুব বেশি দেরি হলো না, জাহাজ থেকে নামার পরে দেখা গেল কল্পনার চিত্রকল্পের উল্টো চিত্র।

কোলাহলমুক্ত দ্বীপকে দেখা ও কিছু ভাল সময় কাটানোর জন্যই এ সময়টা বেছে নেওয়া। অথচ এই দ্বীপের অবস্থা সাহায্য না পাওয়া রুগ্ন মানুষটির চেয়ে ভালো নয়। বিপুল মানুষের জঞ্জালের ভার বহন করে, অসচেতনতা-অপরিচ্ছন্নতা-অপরিকল্পনায় দ্বীপটি সত্যিই রুগ্ন। জাহাজের জেটি ঘাট থেকে শুরু, সেন্টমার্টিনের পুরো বাজারেই হই-হই রব। এ যেন আরেক কারওয়ান বাজার।

সেন্টমার্টিন বাজার থেকে আমাদের রিসোর্ট কিছুটা দূরে, ভেবেছিলাম রিসোর্টে যাওয়ার পথে হয়তো সেন্টমার্টিনের গ্রামটা দেখা হয়ে যাবে কিন্তু তা আর হয়ে উঠল না। যেতে যেতে শুধু আবাসিক, অনাবাসিক হোটেল আর রেস্তোরাঁ চোখে পড়েছে। তবে আমাদের রিসোর্টটা দেখে কিছুটা আশাবাদী হলাম। এখানে রড, ইট, সিমেন্টের পরিবর্তে বাঁশ, কাঠ ও টিনের ব্যবহার করা হয়েছে। যা অনেকটাই  প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে নেওয়া, তবে হতাশ হয়েছি রিসোর্টটির উদ্যোক্তা ইমরানুল আলমের দেওয়া তথ্য জেনে। তিনি জানালেন, ৮/১০ বছর আগে দ্বীপে ৩০/৪০ টি হোটেল-রিসোর্ট থাকলেও এখন সেখানে হোটেল-রিসোর্টের সংখ্যা ১৫০টিরও বেশি। তাছাড়া গত তিন/চার বছর আগেও এ দ্বীপে কোনো ধরনের ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সা ছিল না। ভ্যানে চলাফেরা করত পর্যটক এবং স্থানীয়রা। এখন এই দ্বীপে টমটম রয়েছে ২’শ টিরও বেশি।

সৈকতেও এর ব্যতিক্রম নয়। সারি সারি নারকেল গাছ, কেয়া বন আর প্রবালে ঘেরা দ্বীপটির প্রতিটি সৈকতেরই নৈসর্গিক সৌন্দর্য বর্ণনাতীত। কিন্তু হাজার হাজার পর্যটক পদচিহ্ন ছাড়াও এই দ্বীপে রেখে যান নানা ধরনের বর্জ্য! দ্বীপ যেন বলছিল- ‘আমি আর এ ভার বইতে পারছি না- আমাকে মুক্তি দাও।’

দ্বীপের পরিবেশ, প্রতিবেশ ও জীব-বৈচিত্র্য দিন দিন ধ্বংস হতে চলেছে। সে আশঙ্কার কথা পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে থেকেই বলছেন। এ অবস্থার জন্য যে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন দায়ী-এ কথাও পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো বলেছে বারংবার এবং এ জন্য পর্যটন নিয়ন্ত্রণের সুপারিশও দিয়েছে অনেক।

পরিবেশবাদী সংগঠন সেভ আওয়ার সী-এর মহাসচিব মো. আনওয়ারুল হক বলেন, অতিরিক্ত পর্যটকের কারণে দ্বীপ পরিবেশ ভারসাম্য হারাচ্ছে। এ দ্বীপে পর্যটকের ধারণ ক্ষমতা ২ হাজার। সেখানে প্রতিদিন দ্বীপে অবস্থান করে ১০ থেকে ১২ হাজার পর্যটক। পর্যটকদের ফেলা বর্জ্যের কারণে সাগরতীরের প্রাণ ও জীববৈচিত্র্য আশঙ্কাজনকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাগরে মাছ কমে যাচ্ছে।

দেশের একমাত্র কোরাল আইল্যান্ড এই দ্বীপ। এখানে একসময় বিভিন্ন দেশ থেকে পরিযায়ী পাখিরা এলেও এখন আর আসে না। রাতের বেলায় হোটেল রিসোর্টগুলোর আলোর কারণে কাছিম আর ডিম পাড়তে পারে না। এক সময় এ দ্বীপে প্রচুর শৈবাল চোখে পড়ত। অনিয়ন্ত্রিত পর্যটকের কারণে সেই শৈবাল এখন আর চোখে পড়ে না। এভাবে চলতে থাকলে একদিন হয়তো এ দ্বীপ বিলীন হয়ে যাবে। দিন দিন ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে দেশের অমূল্য সম্পদ এই দ্বীপটি।

 
এ ই    মৌ সু মে   সে ন্ট মা র্টি ন

সেন্টমার্টিন! অসীম নীল আকাশের সাথে সমুদ্রের নীল জলের মিতালি, সারি সারি নারিকেল গাছ এ দ্বীপকে করেছে অনন্য, যা ভ্রমণপিয়াসী মানুষকে দুর্নিবার আকর্ষণে কাছে টেনে নেয়। এরই মধ্যে সেন্টমার্টিনে পর্যটন মৌসুম শুরু হয়েছে। প্রবাল দ্বীপটিতে ভ্রমণে যাওয়ার আগে যেসব তথ্য জেনে নেওয়া জরুরি, সেসব উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছি আমরা—

জাহাজ, ট্রলার ও স্পিডবোট
কক্সবাজারের টেকনাফের দমদমিয়া ঘাট থেকে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশে এখন প্রতিদিন সকাল  ৯টায় কেয়ারি সিন্দাবাদ, কেয়ারি ক্রুজ এন্ড ডাইন, এম ভি বার আউলিয়া জাহাজ চলাচল করছে। এছাড়া দ্য আটলান্টিক ক্রুজ, বে ক্রুজ, গ্রিন লাইন, এমভি পারিজাত, এমভি ফারহানসহ বেশ কিছু জাহাজ চলাচলের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব জাহাজের আসা-যাওয়া ভাড়া ১০০০ টাকা থেকে শুরু হয়ে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত।

চট্টগ্রাম থেকে এমভি বে ওয়ান রাত ১০টায় এবং কক্সবাজার থেকে ভোর ৫টা থেকে ১০টার মধ্যে (জোয়ার-ভাটার ওপর নির্ভরশীল) কর্ণফুলী এক্সপ্রেস চলাচল করে। চট্টগ্রাম থেকে (আপ-ডাউন) সর্বনিম্ন ভাড়া ৪৫০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ভাড়া ৪৫,০০০ টাকা। এছাড়া কক্সবাজার (আপ-ডাউন) থেকে সর্বনিম্ন ভাড়া ৩০০০ টাকা এবং সর্বোচ্চ ভাড়া ২২,০০০ টাকা। টেকনাফ থেকে জাহাজ না পেলে ট্রলার ও স্পিডবোটে সেন্টমার্টিন যাওয়া যায়। তবে পানিভীতি থাকলে ট্রলার ও স্পিডবোটে ভ্রমণ না করাই উত্তম। কারণ সমুদ্রের ঢেউয়ে সমস্যা হতে পারে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ১টার মধ্যে ট্রলার ও স্পিডবোট ছেড়ে যায়। ট্রলার ভাড়া জনপ্রতি ৩৫০ টাকার মধ্যে এবং স্পিডবোট ভাড়া ৮০০টাকা থেকে শুরু হয়।

 
হোটেল, রিসোর্ট ও তাঁবু
সেন্টমার্টিনে রাত্রিযাপন অনেকে কাছে অনেকের কাছে স্বপ্নের মতো। আবার অনেকে প্রতি বছরই জ্যোত্স্নাবিলাস করেন প্রবাল এই দ্বীপে। একসময় সেন্টমার্টিনে সীমিত কিছু রিসোর্ট থাকলেও, বর্তমানে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ! এর ফলে জীববৈচিত্র্য ও দ্বীপের অস্তিত্ব হুমকির মুখে হলেও হাজার হাজার পর্যটকের ঠাঁই হচ্ছে সেসব হোটেলে।

এত এত হোটেল-রিসোর্টের ভিড়েও বর্তমানে সেন্টমার্টিনে বেশ কয়েকটি রিসোর্ট বেশ পরিচিতি পেয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম- দ্বীপান্তর বিচ রিসোর্ট, আটলান্টিক রিসোর্ট, জ্যোত্স্নালয় বিচ রিসোর্ট, গোধূলী ইকো রিসোর্ট, ব্লু মেরিন রিসোর্ট, ফ্যান্টাসি হোটেল এন্ড রিসোর্ট, কিংশুক ইকো রিসোর্ট, মিউজিক ইকো রিসোর্ট, নীল দিগন্ত রিসোর্ট, দ্যা বিচ ক্যাম্প রিসোর্ট ইত্যাদি। এসব রিসোর্টে থাকতে গেলে খরচ করতে হবে ১৮০০ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। তবে মোটামুটি মানে ভালো কটেজে থাকতে ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা খরচ করতে হবে।

যারা বাজেট ট্রাভেলার, তারা বাজারের আশেপাশের রিসোর্ট কিংবা হোম-স্টেগুলোতে থাকতে পারেন। এসব রিসোর্টে ৮০০ থেকে ৫০০০টাকার মধ্যে রুম পাবেন। এছাড়া সেন্টমার্টিনে তাঁবুতে থাকতে পারেন।
সেন্টমার্টিনে রসনাবিলাস
প্রবাল দ্বীপ ভ্রমণে গিয়ে সামুদ্রিক মাছ না খেলে বারো আনাই বৃথা! দুপুর কিংবা রাতে বাজারে সব হোটেলেই মাছ সাজিয়ে রাখা হয়, যেটা যেভাবে বলবেন সেভাবেই আপনাকে পরিবেশন করা হবে। এছাড়া মূল বিচে সন্ধ্যার পরে বসেই চিংড়ি, ক্র্যাব ফ্রাই কিংবা আপনার পছন্দের মাছ বারবিকিউ করতে পারেন। দুপুর ও রাতের খাবারে ২০০ থেকে ৩৫০ টাকা বাজেট রাখতে পারেন। এছাড়া বারবিকিউ প্যাকেজ ৩০০ থেকে এক হাজার টাকার মধ্যেই থাকে।

নারকেলগাছে ভরপুর সেন্টমার্টিন দ্বীপের আরেক নাম ‘নারকেল জিঞ্জিরা’। পর্যটকরা এখানে এলেই ডাবের পানিতে তৃষ্ণা মেটান। কয়েক বছর আগেও এই দ্বীপে প্রতিটি ডাব বিক্রি হয়েছে ৩০ থেকে ৫০ টাকায়। যদিও বর্তমানে সেন্টমার্টিনে ডাব বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৫০ টাকায়।
কী আছে দেখার মতো
পুরো সেন্টমার্টিন-ই দেখার মতো। অফুরন্ত প্রাণের ভাণ্ডার এই দ্বীপ। তবু বিশেষভাবে পশ্চিম বিচে বসে সূর্যাস্ত দেখতে পারেন। সাইক্লিং করে যেতে পারেন দ্বীপের উত্তর পাশের নারিকেল জিঞ্জিরা ও পশ্চিম পাশের কোরাল দ্বীপ। এছাড়া খুব সকালে জেটি ঘাটে সূর্যোদয়, এরপর দেশের সর্ব দক্ষিণের শেষ স্থলভাগ ছেঁড়াদ্বীপ ঘুরে আসতে পারেন।

বিকেলে জেটির বাম পাশের বিচে জেলেদের সাথে জাল টেনে মাছ ধরার অপরূপ দৃশ্য দেখতে পারেন। ভাগ্য ভালো হলে ফ্রি মাছও পেয়ে যেতে পারেন। স্কুবা ড্রাইভিং কিংবা স্নোরকেলিং করতে চাইলে দিনের যেকোনো সময় করতে পারেন। সন্ধ্যায় মূল বিচে বসে বারবিকিউ করতে পারেন। রাতের পরিষ্কার আকাশে দেখবেন লাখ লাখ তারা, ভরা পূর্ণিমা এবং শুনবেন উত্তাল সমুদ্রের গর্জন।