• বৃহস্পতিবার ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ ||

  • ফাল্গুন ৮ ১৪৩০

  • || ১০ শা'বান ১৪৪৫

পিরোজপুর সংবাদ

পেঁয়াজে দুই লাখ টাকা খরচে লাভ ৪ লাখ!

পিরোজপুর সংবাদ

প্রকাশিত: ২৯ নভেম্বর ২০২৩  

চাহিদার থেকে উৎপাদন কম হওয়ায় বরাবরই ঝাঁঝ থাকে রংপুরে পেঁয়াজের বাজারে। তবে গেল কয়েক বছরে সেই চিত্র অনেকটাই বদলে দিয়েছে এই অঞ্চলের কৃষকরা। এখন প্রতি হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষে দুই লাখ টাকা খরচ করে প্রায় চার লাখ টাকা লাভ করছেন তারা। তাই অন্য ফসলের তুলনায় লাভ বেশি হওয়ায় পেঁয়াজ চাষে ঝুঁকছেন এই অঞ্চলের কৃষকরা।

কৃষকের মতে, প্রতি হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ হয় প্রায় দুই লাখ টাকা। হেক্টর প্রতি গড় উৎপাদন ৪২০ মণ। এক হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে যার বাজার মূল সাড়ে ৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা। উৎপাদন খরচ বাদ দিলেও প্রতি হেক্টরে লাভ থাকে প্রায় চার লাখ টাকা। তবে পেঁয়াজ আমদানি হলে কোনো কোনো সময় লোকসানও গুনতে হয় তাদের। তাই আমদানি বন্ধসহ পেঁয়াজ সংরক্ষণে সংরক্ষণাগার নির্মাণের দাবি তাদের।

সরেজমিনে পীরগঞ্জ উপজেলার বড়দরগা ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়, কৃষক শাহানুর মিয়া প্রায় ১৫ বছর ধরে চাষ করছেন পেঁয়াজ। এ বছর এক বিঘা জমিতে নাশিক-৫৩ জাতের পেঁয়াজ আবাদ করেছেন। উৎপাদন খরচ গেছে ২৫-৩০ হাজার টাকা। সব মিটিয়ে যে উৎপাদন হয়েছে তা বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা লাভের আশা তার।

শাহানুর বলেন, বিগত কয়েক বছর থেকে পেঁয়াজের আবাদ করি। অন্যান্য ফসলের চেয়ে লাভ ভালো হওয়ায় পোষায় ভালো। এবার এক কেজি পেঁয়াজের বীজ আর সার দেয় কৃষি অফিস। যে কারণে আবাদের খরচটা কম পড়ছে। সব দিয়ে ৫০ হাজার টাকা লাভের আশা করা যায়।

একই কথা জানালেন বড়দরগার আব্দুল মতিন ও রশিদুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজন কৃষক। সময় সংবাদকে তারা বলেন, পীরগঞ্জে পেঁয়াজের আবাদ সবচেয়ে ভালো। দামও পাওয়া যায় চাহিদা মতো। তাই অন্য ফসলের তুলনায় কৃষকরা বেশি করে পেঁয়াজ চাষ করেছেন।

লালদিঘি এলাকার কৃষক আনোয়ার হসেন বলেন, আমরা যে পেঁয়াজ আবাদ করি তা আমাদের জন্য পর্যাপ্ত। বেঁচে লাভও হয়। তবে সরকার পেঁয়াজ আমদানি করলে তখন আমাদের আবাদ করা পেঁয়াজ কম দামে বিক্রি করতে হয়। যে কারণে মাঝে মাঝে লোকসান গুনতে হয়।

পেয়াজ চাষি জব্বার মিয়া বলেন, আমাদের উত্তরাঞ্চলে প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের শাক-সবজি আবাদ হয়। তবে সংরক্ষণ করতে না পারায় তা মৌসুমে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হই আমরা। রংপুরে শুধু আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা আছে। আমাদের পেঁয়াজসহ অন্যান্য ফসলও যদি রাখার ব্যবস্থা করা যায় তাহলে আমারা ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে পারি।

পীরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাদেকুজ্জামান সরকার বলেন, সরকার বাণিজ্যিকভাবে কৃষিকে এগিয়ে নিতে সবধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছরই জেলায় পেঁয়াজের আবাদ বৃদ্ধির জন্য কৃষকদের প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। প্রণোদনার আওতায় তালিকা করে প্রান্তিক কৃষকদের দেয়া হচ্ছে সার ও বীজ; যার ফলে পীরগঞ্জ উপজেলায় দিন দিন বাড়ছে পেঁয়াজ চাষের জমি ও উৎপাদন।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আশিষ কুমার সাহা বলেন, উত্তরাঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু পেঁয়াজ চাষের উপযোগী। তাই আমরা শুরু থেকে অধিক ফলনশীল জাতের পেঁয়াজ উৎপাদনে কৃষকদের সহযোগিতা করছি। পেঁয়াজের ফলন আরও বাড়তে চলছে গবেষণার কাজ।

রংপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ মৌসুমে পেঁয়াজের চাহিদা ৫৫ হাজার ৪৪৮ টন থাকলেও দুই হাজার ২১৩ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ২৭ হাজার ৯৯৫ টন। সে বছর ঘাটতি ছিল ৩০ হাজার সাত টন। ২০২০-২১ মৌসুমে চাহিদা ছিল ৫৬ হাজার ৬৯০ টন। বিপরীতে দুই হাজার ৮৩৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ উৎপাদন হয় ৩৫ হাজার ৪০০ টন আর ঘাটতি ছিল ২৪ হাজার ৮৩২ টন।

২০২১-২২ মৌসুমে চাহিদা ছিল ৫৭ হাজার ৪৬৯ টন। বিপরীতে দুই হাজার ৯০৬ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয় ৩৮ হাজার ৫২৫ টন। ঘাটতি ছিল ২২ হাজার ৭৯৬ টন। তবে চলতি বছর ৫৮ হাজার ২৫০ টন চাহিদার বিপরীতে জেলায় উৎপাদন হয়েছে ৪৪ হাজার ৫২৩ টন। বিগত বছরগুলোর তুলনায় উৎপাদন বাড়ায় ঘাটতি কমেছে অনেকটা। এরইমধ্যে গ্রীষ্মকালীন বাড়ি-১ ও নাশিক-৫৩ জাতের নতুন পেঁয়াজ তুলতে শুরু করেছেন কৃষক। দাম ভালো পাওয়ায় খুশি তারা।

চলতি বছর জেলায় তিন হাজার ৩২ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের উৎপাদন হয়েছে ৪৪ হাজার ৫২৩ টন। দিন দিন এগিয়ে যাচ্ছে উত্তরের কৃষি অর্থনীতি। বিগত কয়েক বছরে যার বড় সাফল্য এসেছে পেঁয়াজ উৎপাদনে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, কৃষকদের প্রণোদনা দিয়ে পেঁয়াজ চাষের পরিধি আরও বাড়ানো গেলে কমবে আমদানি নির্ভরতা; যার সুবাতাস বইবে গ্রামীণ অর্থনীতিতে।